বাউলশিল্পী আবুল সরকারের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনটি পরিণত হয় এক তাৎপর্যপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও প্রতিবাদী সমাবেশে। শুক্রবার বিকেল চারটায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ‘সম্প্রীতি যাত্রা’–এর উদ্যোগে এই মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বাউল, সুফি, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের নেতা-কর্মীরাও অংশ নেন।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা হাতে নানা প্রতিবাদী পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ান। সেখানে লেখা ছিল— ‘আবুল সরকারের মুক্তি চাই’, ‘গান, জ্ঞান ও ভক্তির নিরাপত্তা চাই’, ‘মাজার দরবার রক্ষা করো’ এবং ‘পৃথিবীটা একদিন বাউলের হবে’—যা আন্দোলনের মূল দাবি ও দর্শনকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে বাউল-ফকিরদের এই শান্তিপূর্ণ অবস্থান প্রবাসী ও দেশীয় সাংস্কৃতিক মহলে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করে।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাংলাদেশ সুফি জাগরণ পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বলেন, “এই দেশের ইতিহাসে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও মানবিক চেতনা বিকাশে সুফি ও বাউল সমাজ বরাবরই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। পরিকল্পিতভাবে বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অবিলম্বে তাঁকে মুক্তি না দিলে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবো।” তাঁর বক্তব্যে উপস্থিত জনতার মধ্যে তীব্র প্রতিবাদী সাড়া দেখা যায়।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক জামশেদ আনোয়ার বলেন, “শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর হামলা, নিপীড়ন কিংবা গ্রেপ্তার সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন। এই দমননীতি কখনোই মেনে নেওয়া যায় না।” তিনি সংস্কৃতির স্বাধীনতা রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু বলেন, “একদিকে সরকার লালন উৎসবের আয়োজন করে, অন্যদিকে বাউল-ফকিরদের ওপর নিপীড়ন চালায়—এই দ্বিচারিতা স্পষ্ট। ফ্যাসিবাদী মনোভাব প্রতিহত করতে সংস্কৃতিকর্মী, ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে।”
মানববন্ধনে আহলে সুন্নত জামায়াতের সভাপতি মাওলানা নূরে আলম সাঈদ সরকারকে তিন দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবুল সরকারকে মুক্তি না দিলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে। বাউল সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিক সরকার জানান, “আবুল সরকার মুক্তি না পেলে দেশের ২০ লাখ বাউল-ফকির রাজপথে নামতে প্রস্তুত।”
মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে খেজুরবাগান মোড় ঘুরে পুনরায় দক্ষিণ প্লাজার সামনে এসে শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ মিছিল শেষ করেন। পুরো কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে বাউল-সুফি ঐতিহ্য রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার ফুটে ওঠে।
