সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক নিয়োগ স্থগিত হচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার মান এবং শিক্ষার্থীর সৃজনশীল বিকাশের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। দেশটি যখন প্রশাসনিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে, তখন মনে রাখতে হবে—গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সাধারণ মানুষের স্বার্থ সবসময় অক্ষুণ্ণ থাকতে হবে।
বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে সংগীত ও খেলাধুলার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এগুলো শিক্ষার্থীর শৃঙ্খলা, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতা বাড়ায়। একই সাথে মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। আজকের যুগে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্যে আছে। সেখানে সংগীত ও খেলাধুলা তাদের মনের অবসাদ কমায়, সৃজনশীলভাবে নিজেকে প্রকাশের সুযোগ দেয় এবং একাগ্রতা বাড়াতে সহায়ক হয়।
বিশ্বের মুসলিম-প্রধান দেশগুলোতে সংগীত শিক্ষা বাধ্যতামূলক। উদাহরণ হিসেবে কুয়েত উল্লেখযোগ্য—সেখানে সকল বিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য সাপ্তাহিক সংগীত ক্লাস বাধ্যতামূলক। ১৯৫৮ সালে কুয়েতে মিউজিক এডুকেশন সুপারভাইজর অফিস প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীত শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তুরস্কেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত বাধ্যতামূলক এবং ২০০৭ সালে আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি যুক্ত করে পাঠ্যক্রম আপডেট করা হয়। মালয়েশিয়াতেও সংগীত শিক্ষাকে জাতীয় পাঠ্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক, শারীরিক এবং সৃজনশীল বিকাশকে উৎসাহিত করে।
বাংলাদেশের সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ইতোমধ্যেই অনেক ক্ষেত্রে নিম্ন। সৃজনশীল বিষয়গুলো বাদ দেওয়া মানে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ শিক্ষার ওপর নির্ভরতা বাড়ানো এবং শিক্ষার মান আরও খারাপ করা। এছাড়াও, এটি সামাজিক বৈষম্য বাড়াবে। দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিশুরা সরকারি বিদ্যালয়ে পড়ছে। সংগীত ও খেলাধুলা বাদ দিলে ধনী ও মধ্যবিত্ত পরিবারে পড়া শিশুরা প্রাপ্ত সুযোগের সঙ্গে তাদের শিশুর শিক্ষার অভিজ্ঞতায় পার্থক্য আরও প্রকট হবে।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া ঐতিহ্যও এই শিক্ষার অংশ। লোকজ গান, নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকর্ম এবং দেশের ক্রীড়া আমাদের জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের নেতৃত্ব, দলবদ্ধ কাজের মানসিকতা এবং শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। যদি স্কুল পর্যায়ে খেলাধুলা ও সংগীত শিক্ষা হ্রাস পায়, তাহলে ভবিষ্যতের প্রতিভাবান খেলোয়াড় ও শিল্পী সৃষ্টির সুযোগ হ্রাস পাবে।
সংস্কার অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু বিদ্যমান কার্যকর নীতিমালা বাতিল করা উচিত নয়। পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও বেতন বৃদ্ধি, অতিরিক্ত কার্যক্রমের জন্য বাজেট বৃদ্ধি—এসবই বাস্তব উন্নয়নের পথ। বিদ্যমান বিষয় বাদ দেওয়া কখনো শিক্ষার মান উন্নয়ন নয়।
সারণী: বিশ্বের সংগীত শিক্ষার উদাহরণ
| দেশ | বৈশিষ্ট্য | নীতি/বছর |
|---|---|---|
| কুয়েত | সাপ্তাহিক বাধ্যতামূলক ক্লাস | ১৯৫৮ সালের অফিস প্রতিষ্ঠা |
| তুরস্ক | প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক | ২০০৭ সালে আধুনিকীকরণ |
| মালয়েশিয়া | জাতীয় পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত | KSSR কাঠামো |
