১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছায়াছবি কবিতা-র এই গানটি সলিল চৌধুরীর সুর ও গীতিকারিত্বে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে বাংলা গানের ইতিহাসে। লতা মঙ্গেশকরের গভীর, করুণ কণ্ঠে গাওয়া এই গানটি কেবল একটি চলচ্চিত্রের গান নয়—এটি মানবমনের গভীরতম ব্যথা, অভিব্যক্তির অভাব এবং অদৃশ্য অনুভূতির এক অসাধারণ কাব্যিক প্রকাশ।
সলিল চৌধুরী এই গানে একটি অসাধারণ রূপক ব্যবহার করেছেন—“অন্ধ খনির অন্তরে থাকে যে সোনা”। অন্ধ খনি, যার চোখ নেই, আলো নেই, তবু তার গভীরে লুকিয়ে আছে অমূল্য সোনা। ঠিক তেমনই মানুষের মনের গভীরে যে ব্যথা, যে ভালোবাসা, যে অপেক্ষা, যে নীরব কান্না জমে থাকে—তা কেউ দেখতে পায় না, কেউ বোঝে না। সবাই জানে সোনার কথা, কিন্তু কেউ জানে না সেই সোনা কত দুঃখের মাঝে লুকিয়ে আছে। এই একটি লাইনেই সলিল চৌধুরী মানবজীবনের এক চিরন্তন সত্যকে ধরে ফেলেছেন।
গানের মূল সুরে বারবার ফিরে আসে “বুঝবে না, কেউ বুঝবে না”—এই কথাটি যেন একটি অসহায় আকুতি। যে ব্যথা কথা বলে না, যে বেদনা চোখের জলে ধোয়া যায় না, যে অনুভূতি শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে যায়—সেই ব্যথাকে কীভাবে বোঝানো যায়? গীতিকার কল্পনা করেছেন, যদি সব বেদনা বীজের মতো বোনা যেত, তাহলে লালে লাল ফুল ফুটত, গানে ভরে যেত চারদিক। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। বেদনা বীজ হয়ে ফুল ফোটে না—সে চুপিচুপি জমে, চুপিচুপি ভিজে, চুপিচুপি শুকিয়ে যায়।
গানের একটি অংশে গায়কের (বা চরিত্রের) নিজের প্রতি এক অদ্ভুত মমত্ববোধ ফুটে ওঠে: “আমি তোমায় কোন দোষ দেব না, আমারই মত জ্বলো, তাও চাবো না”। এখানে ব্যথার মালিক নিজেকে দোষারোপ করেন না, অন্যকে দোষ দেন না—শুধু বলেন, “আমার মতোই জ্বলো, তবু চাবো না”। এই লাইনে এক ধরনের আত্মসমর্পণ আর আত্মমর্যাদার অদ্ভুত মিশ্রণ আছে।
সলিল চৌধুরীর সুর এই গানকে আরও গভীর করে তুলেছে। ধীর, মৃদু, প্রায় কান্নার মতো সুরে লতা মঙ্গেশকর যখন গেয়ে ওঠেন “ভিজে চোখের পাতা”, তখন শ্রোতার বুকের ভেতর কোথাও যেন একটা নিঃশব্দ কান্না জমে যায়।
আজও, প্রায় পাঁচ দশক পরে, এই গান শুনলে মনে হয়—কিছু ব্যথা সময়ের সঙ্গে পুরনো হয় না, কেবল গভীরতর হয়। “বুঝবে না কেউ বুঝবে না” আজও সেইসব মানুষের জন্য গাওয়া হয়, যারা তাদের মনের গভীরতা কাউকে বোঝাতে পারেন না—আর হয়তো বোঝাতে চানও না।

