ভারতীয় সংগীত জগতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। তিনি রোববার দুপুর ১২টায় মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে তিনি গত শনিবার হাসপাতালে ভর্তি হন।
চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। শনিবার রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। রোববার দুপুরে তাঁর ছেলে আনন্দ ভোঁসলে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, আগামী সোমবার তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
আশা ভোঁসলে ১৯৩৩ সালে সংগীত অনুরাগী মঙ্গেশকর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি সংগীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মাত্র নয় বছর বয়সে তিনি পেশাদারভাবে গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৪৩ সালে চলচ্চিত্রে প্রথম গান রেকর্ড করার মাধ্যমে তাঁর সংগীতজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে ১৯৫০-এর দশকে তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীত জগতে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বহু ভাষার চলচ্চিত্রে গান গেয়েছেন এবং বিভিন্ন ধরণের সংগীতধারায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
শুরুর দিকে তিনি মূলত হালকা ধাঁচের গান ও নৃত্যনির্ভর সংগীত পরিবেশনের জন্য পরিচিত ছিলেন। তবে পরবর্তীতে তাঁর শিল্পীসত্তার বিস্তৃতি ঘটে। বিশেষ করে উমরাও জান চলচ্চিত্রে গাওয়া গজলধর্মী গান ‘দিল চিজ কেয়া হ্যায়’ এবং ইজাজত চলচ্চিত্রের ‘মেরা কুছ সামান’ তাঁকে ভিন্ন মাত্রার স্বীকৃতি এনে দেয়। এই গানগুলোর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে, তিনি শুধু হালকা বা বাণিজ্যিক ধারার সংগীতেই সীমাবদ্ধ নন।
দীর্ঘ সংগীত জীবনে তিনি সাতবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পীর পুরস্কার লাভ করেন এবং দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর অর্জন ভারতীয় সংগীত ইতিহাসে এক অনন্য অবস্থান তৈরি করেছে।
নিচে তাঁর প্রধান পুরস্কার ও স্বীকৃতির সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো—
| পুরস্কারের নাম | সংখ্যা | উল্লেখযোগ্য গান |
|---|---|---|
| ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ নেপথ্য কণ্ঠশিল্পী | ৭ বার | বিভিন্ন চলচ্চিত্র |
| জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার | ২ বার | দিল চিজ কেয়া হ্যায়, মেরা কুছ সামান |
ব্যক্তিগত জীবনে আশা ভোঁসলের জীবন ছিল বহু আলোচনার বিষয়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি পারিবারিক অমতে নিজের ব্যক্তিগত সচিব গণপতরাও ভোঁসলের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরবর্তীতে পারিবারিক অশান্তি ও নির্যাতনের কারণে ১৯৬০ সালে তিনি সেই সম্পর্ক থেকে পৃথক হয়ে যান এবং তিন সন্তান নিয়ে নতুন জীবন শুরু করেন।
১৯৮০ সালে তিনি বিখ্যাত সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মণের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক পরবর্তীতে বৈবাহিক জীবনে রূপ নেয়। ১৯৯৪ সালে রাহুল দেব বর্মণের মৃত্যু পর্যন্ত তারা একসঙ্গে ছিলেন।
জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতেন। তাঁর নাতনি জেনাই ভোঁসলে শেষ সময়গুলোতে তাঁর পাশে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় সংগীতের একটি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটল।
