ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল এক সন্ধিক্ষণ। সেই সময়ে পাটনার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ মহম্মদ রেজা খান। যদিও তাঁর সঠিক জন্মসাল নিয়ে মতভেদ আছে, তবে পণ্ডিতদের মতে তিনি অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে জন্মগ্রহণ করেন এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।

Table of Contents
মহম্মদ রাজ । শিল্পী জীবনী
‘নগমাতে আসফী’ ও ঐতিহাসিক পটভূমি
মহম্মদ রেজা খানের অমর কীর্তি হলো তাঁর রচিত সংগীত বিষয়ক উর্দু গ্রন্থ “নগমাতে আসফী” (Naghmat-e-Asafi)।
- রচনাকাল: গ্রন্থটি ১৮১৩ সালে রচিত হয় (কারো মতে এটি ১৭৯১ সালের দিকে শুরু হয়েছিল)।
- রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা: তিনি লখনউয়ের নবাব আসাফ-উদ্দৌলার (১৭৭৫–১৭৯৭) দরবারে সভাসদ ও সংগীতজ্ঞ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। নবাবের নামানুসারেই তিনি তাঁর গ্রন্থের নামকরণ করেন ‘নগমাতে আসফী’।

সংগীততত্ত্বে বৈপ্লবিক সংস্কার
মহম্মদ রেজা খানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো প্রাচীন ও জটিল ‘রাগ-রাগিণী’ পদ্ধতির সংস্কার এবং আধুনিক ‘ঠাট’ পদ্ধতির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন।
১. রাগ-রাগিণী পদ্ধতির নব-বর্গীকরণ
তৎকালীন সময়ে প্রচলিত ‘মত’ (যেমন: শিব মত, কল্লিনাথ মত বা ভরত মত) অনুযায়ী রাগসমূহকে ৬টি রাগ এবং ৩৬টি রাগিণীতে ভাগ করা হতো। কিন্তু মহম্মদ রেজা লক্ষ্য করেন যে, অনেক ক্ষেত্রে রাগের গঠন ও সুরের সাথে এই শ্রেণিবিভাগ মিলছে না। তিনি তাঁর নিজস্ব চিন্তাধারায়:
- রাগগুলোকে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মতভাবে ৬টি রাগ ও ৩৬টি রাগিণীতে নতুন করে বিন্যস্ত করেন।
- অন্যান্য অপ্রধান রাগগুলোকে পুত্র, কন্যা ও পুত্রবধূ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন।
২. বিলাবল ঠাটের প্রবর্তন
আধুনিক হিন্দুস্থানি সংগীতের শুদ্ধ স্বর সপ্তক বা ‘বিলাবল ঠাট’-কে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার কৃতিত্ব অনেকখানি মহম্মদ রেজার। তাঁর আগে ‘কাফি’ ঠাটকে শুদ্ধ স্বর হিসেবে ধরা হতো। পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে তাঁর প্রণীত তত্ত্বে মহম্মদ রেজার এই বিলাবল পদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং একে আধুনিক সংগীতের ভিত্তি হিসেবে স্বীকার করেছেন।

পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে ও মহম্মদ রেজা
আধুনিক ভারতীয় সংগীতের জনক হিসেবে পরিচিত পণ্ডিত ভাতখণ্ডে তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থে মহম্মদ রেজার নাম এবং তাঁর ‘নগমাতে আসফী’ গ্রন্থের বিশেষ উল্লেখ করেছেন। ভাতখণ্ডেজী মনে করতেন, মহম্মদ রেজাই প্রথম ব্যক্তি যিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে প্রাচীন ধ্যান-ধারণা ভেঙে সংগীতকে যুক্তি ও শ্রুতির আধারে বিচার করার চেষ্টা করেছিলেন।
সীমাবদ্ধতা ও প্রভাব
যদিও মহম্মদ রেজার প্রবর্তিত পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতিটি দীর্ঘস্থায়ী বা সর্বজনীন জনপ্রিয়তা পায় নি, তবুও তাঁর সংস্কারগুলো পরবর্তীকালে সংগীতের শ্রেণিকরণ সহজতর করতে সাহায্য করেছিল। তাঁর পদ্ধতিটি মূলত ‘লখনউ মত’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
মহম্মদ রেজা খানের এই গ্রন্থটি বর্তমানে লখনউ এবং ভারতের বিভিন্ন সংগীত মহাফেজখানায় গবেষণার আকর হিসেবে সংরক্ষিত আছে। তাঁর আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের স্বরলিপি ও ব্যাকরণ তৈরিতে সহায়ক হয়েছিল।
একনজরে মহম্মদ রেজা খান
| বিষয় | তথ্য |
| জন্মস্থান | পাটনা, বিহার। |
| প্রধান গ্রন্থ | নগমাতে আসফী (১৮১৩)। |
| পৃষ্ঠপোষক | নবাব আসাফ-উদ্দৌলা (লখনউ)। |
| মূল অবদান | বিলাবল ঠাটকে শুদ্ধ সপ্তক হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও রাগের নব-বর্গীকরণ। |
| ঐতিহাসিক গুরুত্ব | আধুনিক সংগীততত্ত্বের অন্যতম পথিকৃৎ। |
