মারোয়া ঠাট বা মারবা ঠাট । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে প্রতিটি ঠাট একটি স্বতন্ত্র স্বর-পরিবার গড়ে তোলে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট রাগের চরিত্র, সময় ও আবেগ নির্ধারিত থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় Marwa Thaat এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এর স্বরসংস্থান, আবেগ ও প্রয়োগবিধি অন্যান্য ঠাট থেকে আলাদা; বিশেষ করে এর “তীব্র রে (Re♯)” ও “শুদ্ধ মধ্যম (Ma)”—এই যুগল সংঘাতে সৃষ্টি হয় এক অনন্য উত্তেজনা ও আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য।

মারোয়া ঠাট কী?

মারোয়া ঠাট হল হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের দশটি মূল ঠাট-এর একটি। এর স্বরসমষ্টি নিম্নরূপ—

স্বরসংস্থান (Scale of Marwa Thaat)
  • সা (Sa)
  • রে (Re♯ / Teevra Re)
  • গা (Ga)
  • ম (Ma — শুদ্ধ মধ্যম)
  • প (Pa)
  • ধা (Dha)
  • নিঃ (Ni)

এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়:

  • রে (Re) — তীব্র
  • ম (Ma) — শুদ্ধ
    এই বৈপরীত্য মারোয়া ঠাটকে করে তোলে রহস্যময় ও উত্তেজনামুখর।

 

 

আবেগ ও রস (Mood & Rasa)

মারোয়া ঠাটের রাগগুলো সাধারণত প্রকাশ করে—

  • অন্তর্দ্বন্দ্ব
  • বিচ্ছিন্নতা
  • সন্ধ্যার বিষণ্নতা
  • আধ্যাত্মিক আকুতি
  • অশান্ত নিরবতা
  • একধরনের “অমীমাংসিত অপেক্ষা”

এই কারণেই মারোয়া ঠাটের রাগগুলোকে বলা যায় মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার রাগ

সময় (Time Theory)

মারোয়া ঠাটের রাগগুলি সাধারণত গাওয়া হয়—

বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা
এ সময়ের আলো-অন্ধকারের মধ্যবর্তী আবহ মারোয়া ঠাটের অন্তর্গত রাগের সঙ্গে মানসিকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ।

মারোয়া ঠাটের অন্তর্গত প্রধান রাগসমূহ

উল্লেখযোগ্য রাগ তালিকা
  1. রাগ মারোয়া
  2. রাগ পূরিয়া
  3. রাগ সোহিনী
  4. রাগ পূর্বী
  5. বৈভাস
  6. লালিত
  7. পূরিয়া ধনশ্রী (আংশিক প্রভাব)
  8. বাসন্তি
  9. শ্রী

 

 

মারোয়া, পূরিয়া ও সোহিনী — ‘ত্রয়ী রাগ’

মারোয়া ঠাটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল—Marwa–Puriya–Sohini এই তিন রাগের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।

রাগপ্রধান বৈশিষ্ট্য
Marwaতীব্র মানসিক উত্তেজনা
Puriyaগাম্ভীর্য ও স্থিরতা
Sohiniকোমল বিষণ্নতা

এদের আলাদা করে চিনতে পারা একজন ছাত্রের জন্য একটি বড় অর্জন।

বাদ্যযন্ত্রে মারোয়া ঠাট

এই ঠাটের রাগগুলোতে—

  • তানপুরার ড্রোন
  • সেতার
  • সারোদ
  • এসরাজ
  • বাঁশি
  • সরোদ

এসব যন্ত্রে মারোয়ার আবেদন সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা সৃষ্টি করে।

বিশেষত বাঁশিতে Sohini কিংবা সেতারে Marwa এক অনির্বচনীয় আবহ তৈরি করে।

সাধনা ও পরিবেশন কৌশল

মারোয়া ঠাটের রাগ আয়ত্ত করা সহজ নয়। শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু নির্দেশনা—

  • আগে শুদ্ধ রাগ শোনো
  • তারপর স্বরচলন মুখস্থ করো
  • পঞ্চম (Pa) স্বরের বিশিষ্ট ব্যবহারে সতর্ক থাকো
  • ‘নি—সা’ সংযোগে আবেগ বোঝার চেষ্টা করো
  • দীর্ঘ আলাপেই রাগের প্রকৃত সৌন্দর্য ধরা দেয়

 

 

দার্শনিক মাত্রা

মারোয়া ঠাট যেন মানবচেতনাকে প্রশ্ন করে—

  • “আমি কে?”
  • “আলো ও অন্ধকারের মাঝখানে আমার অস্তিত্ব কোথায়?”

এ কারণেই গুরুজনেরা একে বলেন—ধ্যানমগ্ন সন্ধ্যার সঙ্গীত

মারোয়া ঠাট কেবল স্বরসংস্থানের নির্মাণ নয়—এ এক গভীর দর্শন। এই ঠাটের রাগে শোনা যায় না উৎসবের উল্লাস, বরং আত্মার চাপা প্রশ্ন ও সন্ধ্যার বিষণ্ন নীরবতা। একে বোঝা মানে শুধু গান শেখা নয়—নিজেকেও আবিষ্কার করা। যিনি মারোয়াকে হৃদয়ে ধারণ করেন, তিনি কেবল সঙ্গীতজ্ঞ নন—তিনি সন্ধ্যার সঙ্গী।