ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ [ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দী ] Muslim Era in Indian Music [Thirteenth and Fourteenth Centuries] : ভারতীয় সঙ্গীতে মুসলিম যুগ বিশেষকরে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দী নিয়ে আলোচিত হয়েছে এই আর্টিকেলটিতে। ওস্তাদ মুনশি রইসউদ্দিন এই বিষয়ে বিস্তার গবেষণা করেছেন। তার লেখনীই মূলত এই আর্টিকেলে প্রতিপাদ্য বিষয়।

Table of Contents
সঙ্গীতে মুসলিম যুগ : বাদশাহ আলাউদ্দিন খিলজি (১২৯৬–১৩১৬ খ্রীঃ) :
বিলুজি বংশের সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সময় দিল্লীর দরবারে মুসলমানী ও হিন্দুয়ানী সঙ্গীতের মিশ্রনের আভাস পাওয়া যায়। ইহার প্রবর্তক পাক ভারতের কবি ও সঙ্গীতবিদ হযরত আমীর খসরু। তাঁর সমসাময়িক এক অতি প্রভাবশালী হিন্দু গায়ক ছিলেন তাঁর নাম ছিল নায়ক গোপাল। তিনি দক্ষিণ দেশীয় সঙ্গীত নায়ক।
১৩১১ খৃষ্টাব্দের মধ্যে বাদশা আলাউদ্দিন খিজির প্রধান সেনাপতি মালিক কাফুর দাক্ষিণাত্য বিজয় শেষ করার পর, দক্ষিণ দেশ হতে নানা শুনী, পণ্ডিত ও সঙ্গীতবিদগণ বাদশাহের দরবারে পারিতোষিক লাভের আশায় আসতে শুরু করেন। তাঁহাদের ভিতর নায়ক গোপাল থানেশ্বরের তীর্থ থেকে ফিরবার সময় বাদশাহের নিমন্ত্রণে তাঁর দরবারে আসেন।
নায়ক গোপাল দারুণ গায়ক ও বাদক ছিলেন। শোনা যায়, তাঁর নাকি বারশত শিষ্য ছিল- যারা তাঁর পালকি পর্যায়ক্রমে বহন করতো। তিনি কর্ণাটকি ধারায় সঙ্গীতের চর্চ্চা করতেন। তিনি পাক-ভারতীয় (উত্তর ভারতীয়) রাগ-রাগিণী আয়ত্ত্ব করে বহু নতুন রাগ-রাগিনী ও বহু গীত রচনা করেন। তাঁর প্রচলিত পদ্ধতির গীতকে ‘যুগলবন্দ’, ‘খন্ডগীত’ বা ‘ছন্দ-প্রবন্ধ’ বলা হয়।
একদিন নায়ক গোপাল বাদশাহের প্রধান কবি ও গায়ক আমীর খসরুকে সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় আহ্বান করেন। বিষয়টা ছিল খুব গুরুতর ও সমস্যাপূর্ণ এবং কৌতুহলী। কারণ, যে পক্ষ হারবে তাঁর বাদ্যযন্ত্রাদি বিজয়ীর হাতে তুলে দিতে হবে।
আমীর খসরু, সামাত ও নিয়াজ নামক দুই শিষ্যকে নিয়ে মজলিসে আসেন। প্রথমত: ‘ছন্দ’ ‘মনু’, ‘গীত’, সূত, পারসী ও হিন্দি ভাষায় গেয়ে শোনান। পরে স্বরচিত কবিতা পারস্য, আরবীর ‘কওল’ কালুবানা,’ ‘নক্স,’ ‘নিগার,’ ‘গুল,’ হাওয়া,’ ‘বসিত, ‘তারানা,’ প্রভৃতি মুসলিম পদ্ধতিতে গেয়ে সভাস্থ সকলকে মুগ্ধ করেন ও বাহবা নেন নায়ক গোপাল তখন দুঃখের সাথে প্রস্থান করেন। এই দু’জন গুণী সম্বন্ধে বহু কিংবদন্তী থাকলেও অতিশয়োক্তি বোধে আর লিখলাম না।

সঙ্গীতে মুসলিম যুগ : বাদশাহ জয়নুল আবেদীন (১৪১৬–১৪৬৭খ্রীঃ) :
এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে কাশ্মীরের মুসলমান বাদশাহ জয়নুল আবেদীনের নাম পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। তিনি সঙ্গীতের একজন পরম ভক্ত ছিলেন। সঙ্গীতকে তিনি এত বেশী ভালবাসতেন যে, রবাব, বীণা প্রভৃতি যন্ত্রগুলিকে স্বর্ণাবৃত করতঃ অলংকৃত করেও অন্তরের অতৃপ্ত বাসনার নিবৃত্তি করতে পারেননি। তারই নির্দেশে কবি ও সঙ্গীতবিদ লুদী ভট্ট ‘মামক’ (Mamak) নামের একখানা সঙ্গীত গ্রন্থ লিখেন।
সেই সময়ে লেখকের সঙ্গীত প্রতিভা ও বাদশাহের সঙ্গীত প্রীতির কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ায় তৎকালীন গোয়ালিয়রের রাজা ডোঙ্গর সেন লেখকের কৃতিত্ব দেখে দু-তিনখানা প্রামাণ্য সঙ্গীত গ্রন্থ কাশ্মীর দরবারে পাঠিয়ে লেখককে সাহায্য করেন ও এ ধরনের কাজে অনুপ্রাণিত করেন। গোয়ালিয়রের রাজার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র রাজা কিরাত (Kirat) সিংহও পরে পিতৃধারা বজায় রেখেছিলেন।
সঙ্গীতে মুসলিম যুগ : সুলতান হোসেন শাহ-সৰ্কী (১৪৫৭-১৪৮৩ খ্রীঃ) :
হোসেন শাহ-সর্কীর শাসনকাল ১৪৫৭ থেকে ১৪৮৩ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত। তিনি ছিলেন জৌনপুরের স্বাধীন সুলতান। দেশ ও প্রজা-প্রতিপালক হিসেবে সুলতানই শুধু নন, সঙ্গীতের ক্ষেত্রেও তাঁর আসাধান প্রতিতা ও সুলতানী দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। বাদশাহ ও সুলতানদের মধ্যে সঙ্গীতে প্রকৃত গুণী ও বিদ্বান হিসেবে হোসেন শাহ-সকীর নাম ভারতীয় সঙ্গীত জগতে সর্বোপরি (Uppermost)। ঐতিহাসিকগণ বলেন জীবদ্দশায়ই তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়ে।
ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে বাদশাহ আলাউদ্দিন খিলজীর সভাকবি ও সঙ্গীতবিদ হযরত আমীর খসরু প্রবর্তিত (introduced) (খয়াগ (Kheyal system) পদ্ধতি পূর্ণ বিকাশপ্রাপ্ত (Fully developed) হয় সুলতান হোসেন শাহ-সৰ্কী কর্তৃকই। বিগত আড়াই শো বছরেও হযরত আমীর খসরু প্রবর্তিত বিশেষকরে খেয়াল পদ্ধতি শিল্পী ও সমঝদার সমাজে তেমনভাবে কার্যকরী (Effective) হয়নি, যা হয়েছিলো হোসেন শাহ-সকীর আমলে।।

তৎকালে তিনি ছিলেন অতুলনীয় (uncomparable) সঙ্গীতবিদ। তিনিই প্রথম আমীর খসরু প্রবর্তিত খেয়াল পদ্ধতিকে বিস্তৃত বিশ্লেষনের (Analysis and decomposition) মাধ্যমে প্রচার করেন। বর্তমানকালের খেয়াল-গায়কী রীতির উৎসারণের মূলেই যে তিনি তা সর্বসম্মত (universally admitted and accepted)। যুগ ও জনরুচি (Taste) পরিবর্তনের সাথে সাথে সঙ্গীতের বিশেষ করে খেয়াল-রীতির ক্ষেত্রেও বিশেষ পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। তাই সেযুগের খেয়াল-রীতির সাথে বর্তমান খেয়াল রীতির কতটুকু মিল আছে, তা সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য (Noticeable)।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে সুলতান হোসেন শাহসী ছিলেন সর্বগুণাধার (Receptacle of all in virtues) তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক ও রচয়িতা। রাগ সৃষ্ট (Inventor) হিসাবে হযরত আমীর খসরুর পরেই সুলতান হোসেন শাহ-সকীর নাম উল্লেখযোগ্য (notable)। বর্তমানের অতি প্রসিদ্ধ রাগ জৌনপুরী ( জৌনপুরী টোড়িও বলতে শোনা যায়) তাঁরই রচনা। এছাড়া গৌরশাম মলহার-শাম, ভূপাল-শাম ইত্যাদি ১২ প্রকার শাম এবং ৪ প্রকার টোড়ি রচনা ও প্রবর্তন করেন। তন্মধ্যে জৌনপুরী-টোড়ি ও হোসেনী টোড়ি রাগ দুটিই বেশী প্রসিদ্ধ। শোনা যায় পারসিক রাগ ‘জঙ্গুলা’ হ’তে পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ‘জঙ্গুলা’ (জঙ্গলা) তিনিই সৃষ্টি ও প্রবর্তন করেন। ‘হোসেনী কানাড়া’ নামক রাগটিও নাকি তাঁরই সৃষ্ট ও প্রবর্তিত।
আমীর খসরুদ্র খেয়াল-কে তিনি নতুন করে রূপায়িত করেন শোনা যায়, চটকুল’ নামক এক প্রকার গীত রীতির প্রবর্তকও তিনি। অধিকাংশ সঙ্গীত গ্রন্থেই সুলতান হোসেন শাহ-সৰ্কীকে খেয়াল পদ্ধতীয় গায়কীর (Method or style of kheyal singing) প্রথম আবিষ্কারক (Inventor or Discoverer) হিসেবে মানা হয়ে থাকে।

সঙ্গীতে মুসলিম যুগ : রাজা মানসিংহ তানওয়ার বা মানতুনায়ক (১৪৮৬–১৫১৬ খ্রীঃ) :
এই শতাব্দী বা যুগই উত্তর পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ঐতিহাসিক নির্দ্ধারিত যুগ। বিগত যুগে আরব্য পারস্য সঙ্গীতের প্রভাব বিস্তার লাভ করায় তখন পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের ধারা এতই পরিবর্তিত হয় যে, তার আদি স্বরূপ বুঝা বা জানার উপায় ছিলো না।
এই বুঝে গোয়ালিয়রের রাজা মানতুনায়ক বা মানসিংহ তানওয়ার (১৪৮৬-১৫১৬) উত্তর পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের রাগ-রাগিনী ও সঙ্গীত-ধারার নির্দ্ধারণ (Standard style) করেন এবং তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ তিনজন সঙ্গীতবিদ-নায়ক বধূসু, নায়ক ভন্নু ও নায়ক পান্ডেকে আমন্ত্রণ জানান। এরা সবাই ছিলেন তালিঙ্গনা-পন্থী গায়ক।
রাজা মানসিংহ তাঁর নিজের দরবার গায়ক নায়ক মাহমুদ, নায়ক করণ ও নায়ক লোহান এবং আমন্ত্রিত গুণী ত্রয় নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেন এবং তাদের সাহায্যে ও চেষ্টায় এবং নির্দেশানুসারে নিজ নামানুযায়ী ‘মান-কুতূহল’ নামে পাক-ভারতীয় সঙ্গীতের একখানা প্রামাণ্য গ্রন্থ এবং রাগ-রাগিনীর ক্রমভাগ (clssification) সহ হিন্দীভাষায় বহু ধ্রুপদ গান রচনা করেন। পরে তাঁরই চেষ্টায় গোয়ালিয়রে সঙ্গীতের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র স্থাপিত হয়।
রাজা মানসিংহ তানওয়ারই ‘স্থায়ী, অন্তরা, সঞ্চারী ও আভোগ’ চারটি তুক্ বা কলিযুক্ত ধ্রুপদ পদ্ধতির সৃষ্টি করেন। বর্তমান ধ্রুপদের প্রচলিত পদ্ধতি রূপ ও ধারা, যা তাঁরই অবদান বলা হয়। তিনি নিজে যেমন একজন বিখ্যাত সঙ্গীতবিদ ছিলন, তেমনি তাঁর সহধর্মিণী ‘মৃগনয়নীও একজন সঙ্গীতবিদ ছিলেন। রাজার ন্যায় রাণীরও নিজস্ব একটি দরবার ছিল। রাণীর দরবারেও বিশিষ্ট গায়ক-গায়িকার স্থান ছিলো।
সঙ্গীতে মুসলিম যুগ : সুলতান সেকান্দর লোদী (১৪৮৮–১৫১৭ অথবা ১৪৮৯–১৫২৩ খ্রীঃ)
বাহলুল লোদীর পুত্র নিজাম খাঁ সেকান্দার শাহ নাম ধারণ করে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। ইনি ছিলেন একজন ধর্ম বিষয়ে গোড়া সুলতান। তিনি তার রাজ্যে অনেকগুলি বিভিন্ন ধরনের অর্ডিন্যান্স জারী করেছিলেন।
সঙ্গীতের প্রতি তাঁর অতিশয় সহানুভূতি ছিল এবং প্রত্যহ সঙ্গীত শোনাই ছিল তাঁর ধর্ম। কিন্তু নিজের জারীকৃত আইন অমান্যের শরমে নিজ প্রাসাদে সঙ্গীতাদি, আমোদ-প্রমোদ নিষিদ্ধ করে নিকটতম দোস্ত সৈয়দ রুহুল্লা ও সৈয়দ ইব্ন রসুলের বাড়ীতে প্রত্যহ রাত্রি দশটার পরে সঙ্গীতের মহফিল বসাতেন এবং গান বাজনা শুনতেন। তাঁর নিজের ৪ জন ক্রীতদাস ছিলো। এরা ৪ জনই গুণী এবং এই ৪ জন ছাড়া আরও ১০ জন শানুহাই বাদক ছিলেন।

এদের নিয়েই তিনি সঙ্গীতের মহফিল করতেন। উক্ত ৪ জনের মধ্যে একজন ‘চাং’ যন্ত্র, একজন ‘কানুন’, একজন ‘তম্বুরা; এবং একজন ‘বীণা’ বাজাতেন।
সম্রাটের সঙ্গীতানুরাগ ও সঙ্গীত-নৈপুণ্য সম্বন্ধে একথাও শোনা যায় যে, তিনি গোড়া মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও গায়ক ও বাদকদের নিজের ওমরাহদের তাঁবুতে এনে অলক্ষ্যে সঙ্গীত শুনতেন। তাঁর উপরোক্ত চারজন তৃত্যকে চাং, কানুন, বীণা ও তম্বুরা বাজানো শিক্ষা দেন। তাঁর প্রাসাদে নিয়মিতভাবে নওবত-খানায় সঙ্গীতের চর্চ্চা ছিল। তিনি নওবত-খানায় সঙ্গীত শোনার আগে কখনও ঘুমুতে যেতেন না। মালী গৌরা, কল্যাণ, দরবারী-কানাড়া ও হোসেনী কানাড়া রাগগুলি ছিল সম্রাটের প্রিয় রাগ।
সূত্র : প্রবেশিকা সংগীত শিক্ষা পদ্ধতি – ওস্তাদ মুনশী রইসউদ্দিন