২০০৫ সাল। দুই বন্ধু আফতাবুজ্জামান ত্রিদিব এবং শেখ রিয়াজ নিয়মিত আড্ডা দিতেন, যেখানে ক্যারিয়ার এবং জীবনের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। এই আড্ডাগুলোতে প্রায়ই সংগীতের প্রসঙ্গ উঠে আসতো, যা একসময় তাদের মনে জন্ম দেয় এমন একটি ব্যান্ড গড়ার ভাবনা, যা সমাজ ও দেশের কথা বলবে এবং তাদের নিজস্ব জীবনধারা ও চিন্তাভাবনাকে প্রতিফলিত করবে। তারা এমন কিছু তৈরি করতে চেয়েছিলেন যা তাদের জীবনকে ও দর্শনকে অনন্যভাবে প্রকাশ করবে।
২৩ নভেম্বর ২০০৫, ধানমন্ডির মিউজিক ম্যানিয়ায় তাদের প্রথম প্র্যাকটিস সেশন অনুষ্ঠিত হয়। ত্রিদিব (ভোকাল) ও রিয়াজ (ড্রামস) ছাড়াও রুশো খান (বেজ) এবং তামজীদ খান (গিটার) যোগ দেন। এক মাসের মধ্যে গিটারিস্ট ইমরান আহমেদ দলের সঙ্গে যোগ দেন এবং এভাবেই জন্ম নেয় মেকানিক্স।
প্রথম ছয় মাসে একটানা প্র্যাকটিসে সময় কাটে। ব্যান্ডের সদস্যদের শপথ ছিল—নিজেদের পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত কোনো কনসার্ট নয়। ত্রিদিব বলেন, “এই কঠিন সিদ্ধান্তই আমাদের প্রথম শো থেকে আজ পর্যন্ত কখনো কনসার্ট খুঁজতে হয়নি, বরং কনসার্টই আমাদের খুঁজে নিয়েছে।”
Table of Contents
ডি রকস্টার-এ পরিচিতি
২০০৭ সালে মেকানিক্স অংশ নেয় ডি রকস্টার এর দ্বিতীয় সিজনে। সেমিফাইনালে তাদের যাত্রা শেষ হলেও তারা দেশজুড়ে পরিচিতি লাভ করে। ত্রিদিব বলেন, “শুরুতে আমাদের তেমন কোনো প্রত্যাশা ছিল না। মনে হতো, এই ধরনের গান সাধারণ শ্রোতাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।” তবে অডিশন রাউন্ডে বিচারক শাফিন আহমেদ, এরশাদ জামান এবং টনি (ব্ল্যাক) তাদের পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন। ত্রিদিব স্মরণ করেন, “শাফিন ভাই স্টেজ থেকে নেমে এসে আমাদের সঙ্গে হাত মেলালেন। তখনই মনে হয়েছিল, ‘আমরা এটা করতে পারব!’ পর্বটি প্রচারের পর সারা দেশ আমাদের নিয়ে কথা বলছে।” সেই সময়ের কালো বিক্ষোভ এবং অপরাজেয় গান দুটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া তোলে।
ভাঙাগড়ার গল্প
ব্যান্ডের জন্য ভাঙাগড়া স্বাভাবিক ঘটনা হলেও মেকানিক্স-এর জন্য তা ছিল কঠিন বাস্তবতা। ২০০৮ সালে প্রথম অ্যালবাম অপরাজেয় রেকর্ডিং শুরু হলেও, ইমরান আহমেদ ব্যান্ড ছাড়েন। তার জায়গায় যোগ দেন জেহীন আহমেদ। পরের বছর ইকবাল আসিফ জুয়েল-এর রক ২০২ অ্যালবামে ধ্রুবসর গানটি প্রকাশিত হয়, যা এখনো ব্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় গানগুলোর একটি।
২০১০ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য রুশো ব্যান্ড ছাড়েন, এবং তার জায়গায় বেজিস্ট হিসেবে যোগ দেন নাদভী ওয়ালিদ। এই লাইনআপ নিয়েই ২০১১ সালে মেকানিক্স প্রকাশ করে তাদের প্রথম অ্যালবাম অপরাজেয়, যা ডেডলাইন মিউজিকের ব্যানারে বের হয়।
কঠিন সময়ের লড়াই
২০১৩ ছিল মেকানিক্স এর জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়। ব্যক্তিগত কারণে গিটারিস্ট তামজীদ ব্যান্ড ছাড়েন এবং নাদভী বিদেশে চলে যান। ব্যান্ডের ভবিষ্যৎ তখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। নতুন সদস্য হিসেবে শাহেদ (গিটার) এবং তানিম পাবেল (বেজ) যোগ দেন। ২০১৪ সালে রক টেন মিক্সড অ্যালবামে এলিজি গানটি প্রকাশিত হলে শ্রোতাদের মাঝে প্রশংসা লাভ করে।
তবে কনসার্টে ব্যস্ত সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন গিটারিস্ট জেহীন আহমেদ। পাকস্থলীর জটিলতা ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছিলেন তিনি। কিছুদিন গেস্ট মেম্বারদের নিয়ে পারফর্ম করে ব্যান্ড। পরে ২০১৬ সালে জেহীন কিছুটা সুস্থ হলে তারা আবার মঞ্চে ফেরে। সেই সময় বেজে আবার যোগ দেন নাদভী, এবং গিটারিস্ট শাহেদের জায়গায় আসেন সাফাত চৌধুরী। ত্রিদিব, জেহীন, রিয়াজ, সাফাত ও সালেক মিলে আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করেন।
জেহীনের চিরবিদায়
২০১৭ সালের ২২ জুলাই মেকানিক্স এর জন্য ছিল এক শোকের দিন। ওই দিনই গিটারিস্ট জেহীন আহমেদ মারা যান। ত্রিদিব বলেন, “জেহীনের চলে যাওয়াতে আমরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। এমন মনে হচ্ছিল, যদি মেকানিক্স থেমে যায়, তাহলে হয়তো আমাদেরও আর চলা হবে না। তবে আমরা ঠিক করি, জেহীনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে আবার শুরু করব।” নতুন গেস্ট মেম্বার শুভ্র ব্যান্ডে যোগ দেন এবং জেহীনসহ সাবেক সদস্যদের স্মরণ করে প্রকাশিত হয় গান নিয়তি, যা শ্রোতাদের কাছে গভীরভাবে পৌঁছায়।
সংকট কি শেষ হলো?
না, ভাঙাগড়ার এই খেলা এখানেই শেষ হয়নি। ২০১৮ সালের শেষে সালেক ব্যান্ড ছাড়েন এবং শুভ্র একক ক্যারিয়ারে মনোনিবেশ করেন। এরপর গিটারিস্ট হিসেবে সাইফ ইরফান এবং বেজিস্ট হিসেবে সৌমিক ইসলাম যোগ দেন। ত্রিদিব বলেন, “সাইফ আর সৌমিককে পেয়ে যেন আশার আলো দেখতে পাই। সাইফের সঙ্গে আমাদের কেমিস্ট্রি অনেক আগে থেকেই ছিল। সে একজন অসাধারণ গিটারিস্ট। আর সৌমিক অত্যন্ত দক্ষ মেটাল প্লেয়ার। এখন এই লাইনআপ নিয়েই আমরা আছি। আমাদের ম্যানেজার মিঠুন হাসানকে ধন্যবাদ, ২০১৫ সাল থেকে আমাদের এই যাত্রাকে অনেক সহজ করেছেন।”
দুই দশকের উদযাপন
২০ বছর পূর্তিতে মেকানিক্স দেশজুড়ে কনসার্ট ট্যুর করছে। ইতিমধ্যে তারা ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা ও যশোরে পারফর্ম করেছে এবং আরো কয়েকটি জেলায় শো করার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকায় একটি বড় কনসার্ট আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে, যেখানে পুরোনো সদস্যদেরও দেখা যাবে মঞ্চে। ত্রিদিব বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি সংগীত পৃথিবীকে বদলে দিতে পারে। মেকানিক্স কে আরও অনেক দূর নিয়ে যেতে চাই। যদি ওয়ারফেজ এর মতো ৪০ বছর ধরে টিকে থাকতে পারি, সেটাই হবে আমাদের সাফল্য। আসলে ব্যান্ডের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো সেই বোঝাপড়া, যেখানে আমার মনের কথা না বললেও অন্যজন তা বুঝে নেয়। ২০ বছরের এই পথচলায় সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় জয়।”
