মোবারক হোসেন খান । বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী ও সংগীত গবেষক

মোবারক হোসেন খান ছিলেন একজন বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী ও সংগীত গবেষক। উপমহাদেশের কৃতলক্ষণ এক সংগীত পরিবারে তাঁর জন্ম। স্বাধীনতা-উত্তরকালে তিনি বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। সংগীতে অবদানের জন্য নানান রাষ্ট্রীয় সম্মাননা-প্রতিমাননায় প্রশংসাপ্রাপ্ত হন। এর মধ্যে উল্লেখ্য হচ্ছে একুশে পদক (১৯৮৬), স্বাধীনতা পদক (১৯৯৪), এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০০২)।

 

মোবারক হোসেন খান । বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী ও সংগীত গবেষক

প্রাথমিক জীবন

মোবারক হোসেন ১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামের এক সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ একজন প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী এবং মাতা উমর-উন-নেসা। তার চাচা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ। সাত ভাইবোনের মধ্যে মোবারক ষষ্ঠ এবং ভাইদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ। তার বড় তিন বোন আম্বিয়া, কোহিনূর, ও রিজিয়া এবং বড় দুই ভাই প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আবেদ হোসেন খান ও বাহাদুর হোসেন খান, এবং ছোট বোন মমতা।

 

YaifwwriN4BzRFCyqbslL4 মোবারক হোসেন খান । বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী ও সংগীত গবেষক
আমাদেরকে গুগল নিউজে ফলো করুন

 

পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী বড় দুই ভাই সঙ্গীতে মগ্ন। তাই তার পিতা চেয়েছিলেন তিনি যেন সঙ্গীতের পাশাপাশি পড়াশুনা করেন। এজন্য সঙ্গীতে দীক্ষা গ্রহণের পূর্বে তিনি মাইনর স্কুলে প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত পাঠ গ্রহণ করেন। দেশ বিভাগের পূর্ব থেকে তার পিতার গান শিখানোর উদ্দেশ্যে কুমিল্লা জেলায় যাতায়াত ছিল এবং ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তারা সপরিবারে সেখানে চলে যান। মোবারক সেখান কুমিল্লা জিলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৫২ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

 

কর্মজীবন

মোবারক হোসেনের কর্মজীবন শুরু হয় বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে ২০ অক্টোবর, ১৯৬২। পরে তিনি বেতারের পরিচালক হিসেবে ৩০ বছর কর্মরত ছিলেন। এরপরে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক পদে কর্মরত থাকেন ১৯৯২-১৯৯৬ পর্যন্ত। ২০০০ -২০০৫ পর্যন্ত তিনি একটি এনজিও-এর নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। এছাড়াও ২০০০-২০০৪ তিনি নজ্রুল ইন্সটিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৭৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত তিনি মোট ১৩৭টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন। ১৯৮০ সালে তিনি সঙ্গীতের উপর প্রথম পান্ডুলিপি রচনা করেন। সঙ্গীত বিষয়ক লেখা কেউ প্রকাশের দায়িত্ব না নিতে চাইলে তা প্রকাশের দায়িত্ব নেন রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই।

লেখালেখি সূত্রে পরিচয় হন কবি আল মাহমুদের সাথে। আল মাহমুদ তখন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহকারী পরিচালক। তার মাধ্যমে ১৯৮০ সালে শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রকাশ করেন তার প্রথম সঙ্গীত বিষয়ক বই সংগীত প্রসঙ্গ। বিভিন্ন পত্রিকায় তার সঙ্গীত বিষয়ক লেখা নিয়ে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় বই বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ। এরপর তিনি রচনা করেন সঙ্গীত মালিকা। এই বইটিও প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি।

পরবর্তীতে তিনি সঙ্গীত বিষয়ক মৌলিক গ্রন্থ ৩৩টি (এর মধ্যে ইংরেজিতে ৩টি), শিশুতোষ সঙ্গীত বিষয়ক ১৯টি গ্রন্থ রচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের উপরে লেখা তাঁর চারটি বই বিশেষভাবে উল্লেখ্য। এছাড়া তাঁর অনুদিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৩টি, শিশুতোষ অনুবাদ গ্রন্থ ২০টি, শিশুতোষ গল্পের বই ৩৪টি, উপন্যাস ২টি, এবং আত্মজীবনীমূলক রচনা ২টি।

 

ব্যক্তিগত জীবন

মোবারক হোসেন সঙ্গীতশিল্পী ফৌজিয়া ইয়াসমিনকে বিয়ে করেন। তাঁদের তিন সন্তান; কন্যা রিনাত ফৌজিয়া সঙ্গীতশিল্পী,[৩] পুত্র স্থপতি তারিফ হায়াত খান এবং তানিম হায়াত খান।

সম্মাননা

  • শিল্পকলায় অবদানের জন্য ১৯৮৬ সালে একুশে পদক।
  • সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে পেয়েছেন ‘কুমিল্লা ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক’।
  • সঙ্গীতে অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার।
  • ২০০২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
  • অনুবাদে ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’।
  • ২০০৮ সালে একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়া থেকে সংবর্ধনা।

মৃত্যু

মোবারক হোসেন খান ২০১৯ সালের ২৪ নভেম্বর ৮১ বছর বয়সে বার্ধক্যজনিত রোগে মৃত্যুবরণ করেন।

Leave a Comment