মোবারক হোসেন খানের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী: সুরের অমর পথিক

বাংলাদেশের সংগীতচর্চা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিকাশে অবিস্মরণীয় অবদান রাখা শিল্পী মোবারক হোসেন খান। ২৪ নভেম্বর তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী অতিক্রান্ত হলো নিভৃতে স্মরণ, গভীর শ্রদ্ধা এবং সৃষ্টির আলোকে। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী ছিলেন কণ্ঠশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, গবেষক, লেখক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক—সব ভূমিকায়ই তিনি রেখেছেন স্থায়ী ছাপ।

উপমহাদেশের ঐতিহ্যবাহী সুরঘরানার উত্তরসূরি

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শিবপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া মোবারক হোসেন খান সঙ্গীতমণ্ডিত এক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। তাঁর পিতা ওস্তাদ আয়েত আলী খান ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত সেতারবাদক ও সুরসাধক। তাঁর চাচা কিংবদন্তি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান, যিনি মাইহার ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা এবং পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও আলী আকবর খানের গুরু। এমন সুরঘেরা পরিবেশেই তাঁর শৈশব কাটে, আর সেখান থেকেই সৃষ্টির প্রথম সুরধ্বনি।

শিক্ষা ও পেশাগত জীবন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে এমএ সম্পন্ন করার পর তিনি ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় বাংলাদেশ বেতার–এ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দেশের সাংস্কৃতিক অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং নজরুলচর্চা প্রসারে অবদান রাখেন।

বাদ্যযন্ত্র শিক্ষায় তাঁর পথচলা

পারিবারিক রেওয়াজ অনুযায়ী, স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সঙ্গীতের পাশাপাশি বাদ্যযন্ত্র শেখানো হতো। তাঁর প্রথম শেখা যন্ত্র ছিল বেহালা। পরে ‘মন্দ্রনাদ’ ও ‘চন্দ্রসারং’ নামে দুটি বিরল ধাঁচের তারযন্ত্রেও তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। একই সঙ্গে তিনি তবলাউচ্চাঙ্গ সংগীতেরও নিবিড় ছাত্র ছিলেন।
চাচাতো ভাই ওস্তাদ খাদেম হোসেন খান এবং ভাগ্নে ওস্তাদ খুরশিদ খান–এর সঙ্গে তিনি মঞ্চে ও স্টুডিওতে বহুবার বাজিয়েছেন। জীবনের শেষভাগে নিজের সাধনার যন্ত্র হিসেবে তিনি বেছে নেন সুরবাহার, এই যন্ত্রেই তাঁর শিল্পীসত্তা সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়। বিটিভির জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘সুরলহরী’–তে দীর্ঘদিন তিনি সুরবাহার বাজিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন।

গবেষণা, লেখালেখি ও পুরস্কার

মোবারক হোসেন খান সংগীত, সংস্কৃতি, অনুবাদ ও মুক্তিযুদ্ধ–বিষয়ক বহু গ্রন্থের লেখক। তাঁর গবেষণা উচ্চাঙ্গ সংগীতের ইতিহাস ও ভাষ্যকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে।

সংগীত গবেষণায় অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন—

  • একুশে পদক
  • স্বাধীনতা পদক
  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার
  • অলকৃত সাহিত্য পুরস্কার (অনুবাদ)

স্মরণ

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গন তাঁকে স্মরণ করে আজও বলে—তিনি ছিলেন এক নিবেদিতপ্রাণ সুরসাধক, যার জীবন সংগীতের গভীরতাকে ছুঁয়ে গেছে। তাঁর রেখে যাওয়া কাজ, বই, পরিবেশনা এবং সাংস্কৃতিক অবদান আগামী প্রজন্মকে পথ দেখিয়ে যাবে।

প্রোফাইল সংক্ষেপ (টেবিল)

বিষয়তথ্য
নামমোবারক হোসেন খান
জন্মস্থানশিবপুর, নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মৃত্যুবার্ষিকী২৪ নভেম্বর (৬ষ্ঠ)
পারিবারিক পটভূমিপিতা ওস্তাদ আয়েত আলী খান; চাচা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান
শিক্ষাঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাসে এমএ
পেশাকণ্ঠশিল্পী, বাদ্যযন্ত্রী, গবেষক, লেখক, সাংস্কৃতিক সংগঠক
কর্মজীবন৩০+ বছর বাংলাদেশ বেতার; শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক; নজরুল ইনস্টিটিউট ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি
দক্ষতাবেহালা, মন্দ্রনাদ, চন্দ্রসারং, তবলা, সুরবাহার
উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানবিটিভির ‘সুরলহরী’-তে সুরবাহার পরিবেশনা
পুরস্কারএকুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, অনুবাদে অলকৃত সাহিত্য পুরস্কার

 

আপনি চাইলে এই সংবাদটির আরও সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, টিভি নিউজ স্ক্রিপ্ট বা সোশ্যাল মিডিয়ার উপযোগী ক্যাপশনও তৈরি করে দিতে পারি।