কাজী নজরুল ছিলেন তৎকালীন “ভারতের মোস্ট পেইড সুপারস্টার’ !

বিশ শতকের তিরিশের দশকে অবিভক্ত ভারতের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক মানচিত্রে কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন বিদ্রোহী কবি বা সুরকার ছিলেন না, তিনি ছিলেন তৎকালীন সংগীত শিল্পের সবচেয়ে দামি এবং প্রভাবশালী ‘ব্র্যান্ড’। আধুনিক বাজার অর্থনীতির পরিভাষায় যাকে আমরা ‘মোস্ট পেইড সেলিব্রিটি’ বলি, নজরুল সেই সময়ে গ্রামোফোন কোম্পানি বা এইচএমভি-র কাছে ঠিক সেই অবস্থানেই ছিলেন। ১৯৩০ সালের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট, মুদ্রার মান এবং সামাজিক গুরুত্ব বিবেচনা করলে দেখা যায়, নজরুলের সৃজনশীলতা কেবল শিল্পতাত্ত্বিক বিজয় নয়, বরং এটি ছিল একটি বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি। তাঁর গান মানেই ছিল নিশ্চিত মুনাফা, আর তাঁর নাম মানেই ছিল রেকর্ডের গায়ে রাজকীয় সিলমোহর।

কাজী নজরুল ইসলাম
কাজী নজরুল ইসলাম

নজরুলের এই বাণিজ্যিক আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ব্রিটিশ পণ্য-বিক্রয় প্রতিষ্ঠান এইচএমভি বা ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’। ১৯২৮ সালে নজরুল যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এইচএমভি-র সাথে যুক্ত হন, তখন গ্রামোফোন রেকর্ড শিল্পে এক অভাবনীয় বিপ্লব ঘটে। এইচএমভি কর্তৃপক্ষ অনুধাবন করেছিল যে নজরুলের বহুমুখী প্রতিভা—অর্থাৎ একই সাথে গীতিকার, সুরকার এবং প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা—তাদের ব্যবসার ভোল বদলে দিতে পারে। নজরুলকে তারা নিয়োগ দিয়েছিল ‘চিফ ট্রেনার’ বা প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে। তাঁর কাজ ছিল নতুন গানের বাণী তৈরি করা, সুরারোপ করা এবং নবীন শিল্পীদের কণ্ঠ তৈরি করে দেওয়া। এই পদের জন্য নজরুল যে পারিশ্রমিক ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন, তা সেকালের যেকোনো উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তার কল্পনারও অতীত ছিল।

১৯৩০-এর দশকের শুরুর দিকে নজরুলের মাসিক বেতন ছিল প্রায় ৫০০ টাকা। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এই অঙ্কটি সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু সেই আমলের স্বর্ণের দামের সাথে তুলনা করলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায়। ১৯৩০ সালে প্রতি ভরি সোনার গড় দাম ছিল মাত্র ১৮ থেকে ২০ টাকা। অর্থাৎ, নজরুল তাঁর এক মাসের বেতন দিয়ে প্রায় ২৫ ভরি সোনা কিনতে পারতেন। ২০২৬ সালের বর্তমান বাজারদরে ২৫ ভরি সোনার মূল্য প্রায় ৩১ থেকে ৩২ লক্ষ টাকা। ভারতের অন্য কোনো সাহিত্যিক বা সংগীতজ্ঞ সেই সময়ে একক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে এত বিপুল পরিমাণ নিয়মিত পারিশ্রমিক পেতেন না।

নজরুল তার সেই বেতনের বাইরে আয় করতেন বেতনের চেয়েও বেশি টাকা। কারণ বেতনের বাইরেও ছিল তাঁর গানের বিক্রির ওপর নির্দিষ্ট হারের রয়্যালটি। এর উপরে তিনি পেতেন তাঁর প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ গান দেওয়ার শর্তে একটি স্থায়ী ‘রিটেইনার ফি’। সব মিলিয়ে তিনি প্রতি মাসে এমন অংকের টাকা কামাই করতেন, যা একজন সাধারণ শিল্পীর সারা জীবনের আয়ের সমান। কারন একটি গান রেডর্ক করে শিল্পী পেতেন বড়জোর ১০ থেকে ২৫ টাকা।

এইচএমভি নজরুলকে কেবল অর্থই দেয়নি, দিয়েছিল অগাধ স্বাধীনতা ও রাজকীয় মর্যাদা। কলকাতার দমদমে অবস্থিত এইচএমভি-র বিশাল কারখানায় এবং ৩ নম্বর মিডলটন স্ট্রিটের অফিসে নজরুলের জন্য একটি বিশেষ সুসজ্জিত কক্ষ বরাদ্দ ছিল। সেখানে তিনি তাঁর সৃজনশীল কাজ পরিচালনা করতেন। এইচএমভি-র মতো কট্টর বাণিজ্যিক ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান নজরুলের খামখেয়ালি স্বভাব, দেরি করে অফিসে আসা কিংবা হুটহাট অগ্রিম টাকার আবদার সবসময় হাসিমুখে মেনে নিত। এর একমাত্র কারণ ছিল নজরুলের সৃজনশীল আউটপুট। নজরুল ছিলেন একটি ‘হিট মেশিন’। তিনি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৪০টি গান তৈরি করতেন। অনেক সময় দেখা গেছে, স্টুডিওতে রেকর্ডিং চলছে আর বারান্দায় বসে নজরুল তৎক্ষণাৎ গানের বাণী ও সুর লিখে দিচ্ছেন। তাঁর তৈরি একটি ইসলামী গজল বা একটি শ্যামাসংগীত মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার রেকর্ড বিক্রির রেকর্ড গড়ত।

এইচএমভি প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের রেকর্ড
এইচএমভি প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের রেকর্ড

নজরুল ব্র্যান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সর্বজনীনতা। তিনি একই সাথে শ্যামাসংগীত লিখে হিন্দু সম্প্রদায়ের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন, আবার ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’র মতো গান লিখে মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে গ্রামোফোন পৌঁছে দিয়েছিলেন। ১৯৩২ সালে আব্বাসউদ্দীন আহমদের কণ্ঠে নজরুলের ইসলামী গানগুলো যখন রেকর্ড হয়, তখন ভারতের মুসলিম সমাজ যারা আগে গান-বাজনাকে এড়িয়ে চলত, তারাও গ্রামোফোন কিনতে শুরু করে। নজরুলের গান ছিল এইচএমভি-র ব্যবসার প্রধান অনুঘটক। এমনকি এইচএমভি-র সস্তা লেবেল ‘জোনোফোন’-এর বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে গিয়েছিল কেবল নজরুলের নাম যুক্ত হওয়ার কারণে। কে এল সায়গল, ইন্দুবালা, আঙ্গুরবালা বা যূথিকা রায়ের মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের জনপ্রিয়তার পেছনে মূল কারিগর ছিলেন নজরুল।

তৎকালীন সিনেমার জগতেও নজরুলের চাহিদা ছিল আকাশচুম্বী। ‘ধ্রুব’, ‘পাতালপুরী’ বা ‘বিদ্যাপতি’র মতো সিনেমার সংগীত পরিচালনার জন্য তিনি যে পারিশ্রমিক নিতেন, তা তৎকালীন বোম্বে বা কলকাতার অন্য যেকোনো সংগীত পরিচালকের চেয়ে বেশি ছিল। তিনি কেবল সুর দিতেন না, সিনেমার দৃশ্য অনুযায়ী চরিত্রগুলোর মেজাজ বুঝে সুর বাঁধতেন। নজরুলের এই পেশাদারিত্ব এবং দ্রুত কাজ করার ক্ষমতা তাঁকে ভারতের সবচেয়ে দামি সংগীত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল।

এর বাইরে আকাশবাণী বা তৎকালীন ভারতীয় বেতারে নিয়মিত প্রোগ্রাম এবং পরামর্শক হিসেবে কাজ করে তিনি মাসে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা পেতেন। এছাড়া বিভিন্ন জলসা বা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য তাঁকে বিশেষ সাম্মানিক দেওয়া হতো।বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নজরুলের আয়ের হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে বিভিন্ন উৎস থেকে (কেবলমাত্র সৃজনশীল কাজ ও রয়্যালটি বাবদ) তাঁর গড় আয় ছিল আজকের বাজারমূল্যে প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ টাকার সমতুল্য। অর্থাৎ, বার্ষিক হিসেবে তাঁর আয় ছিল ১৩ কোটি টাকারও বেশি। ১৯৩২ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত নজরুলের সৃজনশীল জীবনের সবচেয়ে সক্রিয় ১০ বছরের মোট উপার্জনের পরিমাণ ছিল বর্তমানের ১০০ কোটি টাকারও অধিক। এই তথ্যটিই প্রমাণ করে যে, তৎকালীন অবিভক্ত ভারতে কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি বা শিল্পী ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একাধারে সবচেয়ে দামী এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল এক অনন্য ‘মিউজিক ব্র্যান্ড’।

নজরুলের এই ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ কেবল অর্থের মাপকাঠিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, এটি ছিল সাংস্কৃতিক প্রভাবের এক চরম শিখর। ব্রিটিশ সরকার তাঁর বিদ্রোহী গানের জন্য মাঝেমধ্যেই রেকর্ড বাজেয়াপ্ত করত, কিন্তু এইচএমভি তবুও নজরুলকে ছাড়েনি। কারণ তারা জানত, নজরুলের নাম ছাড়া ভারতের বাজারের সিংহভাগ দখল করা অসম্ভব। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান যেখানে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, নজরুলের গান সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল সাধারণ কৃষক, শ্রমিক এবং মধ্যবিত্তের ঘরে ঘরে। নজরুলের গজল, ভজন, কীর্তন এবং আধুনিক গানগুলো গ্রামোফোন কোম্পানিকে একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিল।

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ভারতের সংগীত ইতিহাসের প্রথম আধুনিক সেলিব্রিটি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে একজন সৃজনশীল শিল্পী কেবল দারিদ্র্য আর অনাহারে দিন কাটাবেন না, বরং নিজের মেধা আর শ্রম দিয়ে একটি বাজার ব্যবস্থার অধিপতি হতে পারেন। ১৯৩০-এর দশকে নজরুলের সেই ৫০০ টাকা বেতন আর ২৫ ভরি সোনা কেনার ক্ষমতা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সচ্ছলতার প্রমাণ নয়, বরং এটি ছিল বাংলা সংগীতের সেই স্বর্ণযুগের স্মারক, যেখানে সুর আর বাণীর জাদুকর নজরুল ছিলেন অবিসংবাদিত সম্রাট। এইচএমভি এবং নজরুল—এই দুইয়ের মেলবন্ধন না ঘটলে হয়তো ভারতীয় সংগীতের আধুনিক রূপান্তর আরও কয়েক দশক পিছিয়ে যেত। নজরুলের সেই রাজকীয় প্রতিভা আজও সারেগামা (সাবেক এইচএমভি) এর আর্কাইভে অমলিন হয়ে আছে।

এইচএমভি প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের রেকর্ড (1)
এইচএমভি প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামের রেকর্ড

এত বিপুল অর্থ উপার্জন করা সত্ত্বেও কাজী নজরুল ইসলামের ব্যক্তিগত জীবনে কোনো বিলাসিতা বা সঞ্চয়ের মোহ ছিল না। তিনি ছিলেন মূলত এক ‘উদাসীন সম্রাট’, যার কাছে শিল্পের মূল্য ছিল অর্থের চেয়ে বহুগুণ বেশি। তাঁর উপার্জনের একটি বিশাল অংশ ব্যয় হতো স্ত্রী প্রমীলা দেবীর দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল চিকিৎসায়। কিন্তু এর বাইরেও তাঁর ছিল এক অদম্য দানশীলতা। নজরুলের কাছে টাকা থাকা মানেই ছিল তা অভাবী শিল্পী, বন্ধু কিংবা আর্তমানবতার সেবায় বিলিয়ে দেওয়া। কোনো সাহায্যপ্রার্থী তাঁর দুয়ার থেকে কোনোদিন খালি হাতে ফেরেনি।

ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় কিংবা লাভজনক বিনিয়োগে তিনি কখনোই বিশ্বাসী ছিলেন না। এমনকি প্রকাশক বা গ্রামোফোন কোম্পানিগুলোর সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির মারপ্যাঁচ বোঝার চেয়ে তিনি সুর আর বাণীর সৃজনশীলতায় মগ্ন থাকতেই বেশি ভালোবাসতেন। এই সরলতার সুযোগ নিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান তাঁকে আর্থিকভাবে বঞ্চিতও করেছে। ১৯৩৯ সাল থেকে শুরু হওয়া পারিবারিক বিপর্যয় এবং স্ত্রীর পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীরের চিকিৎসা নজরুলের দীর্ঘদিনের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। সারাজীবন কয়েক কোটি টাকা আয় করার পরেও দুহাতে উজাড় করে দেওয়ার চিরকালীন অভ্যাস এবং হিসাবহীন জীবনবোধ শেষ বয়সে তাঁকে চরম সংকটে ফেলেছিল।

১৯৪২ সালে কবির নির্বাক হয়ে যাওয়ার পর তাঁর পরিবার কয়েক বছর অত্যন্ত অর্থকষ্টে দিনাতিপাত করে। পরবর্তীতে ভক্ত, শুভানুধ্যায়ী এবং ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’র আন্তরিক প্রচেষ্টায় কিছু অর্থ সংগৃহীত হয়। যদিও ভারত ও তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পরবর্তীতে তাঁকে সামান্য কিছু পেনশন ভাতা প্রদান করেছিল, কিন্তু তাঁর এবং তাঁর পরিবারের চিকিৎসার বিশাল ব্যয়ের তুলনায় তা ছিল নিতান্তই অপ্রতুল। নজরুল আজীবন যা আয় করেছেন, তা দিয়ে অনায়াসেই রাজকীয় বৈভবে দিন কাটাতে পারতেন; কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন মানুষের ভালোবাসা আর ত্যাগের পথ। তাই কোটি টাকার সেই ‘সুপারস্টার’ নজরুল দিনশেষে বাঙালির হৃদয়ে থেকে গেছেন এক চিরস্থায়ী নিঃস্ব, অথচ অবিনশ্বর বিদ্রোহী সত্তা হিসেবে।