রবীন্দ্রসঙ্গীতে মিতা হকের জীবন ও অবদান

মিতা হক ছিলেন বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীতাঙ্গনের একজন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী, যাঁর পরিবেশনায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান এক বিশেষ নান্দনিকতা ও পরিশীলিত রূপ লাভ করে। তাঁর গায়কীতে শুদ্ধতা, আবেগ এবং দীর্ঘ সঙ্গীতচর্চার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। তিনি বাংলাদেশ বেতারের সর্বোচ্চ গ্রেডের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে দীর্ঘ সময় সঙ্গীতাঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৬২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন মিতা হক। তাঁর সঙ্গীত শিক্ষার সূচনা ঘটে পারিবারিক পরিমণ্ডলে। প্রথম পর্যায়ে তিনি তাঁর চাচা ওয়াহিদুল হক-এর কাছে গান শেখেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান এবং ড. সনজীদা খাতুন-এর তত্ত্বাবধানে তাঁর সঙ্গীতজ্ঞান ও পরিবেশন দক্ষতা আরও সুগঠিত ও পরিপূর্ণ হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম গ্রহণ শুরু করেন, যা তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনাকে আরও গভীর ও পরিমার্জিত করে তোলে।

মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিশু উৎসবে অংশগ্রহণ করেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রাথমিক উপস্থিতির পরিচয় বহন করে। তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীতজীবনে তিনি মোট ২৪টি একক অ্যালবাম প্রকাশ করেন। এর মধ্যে ১৪টি ভারত থেকে এবং ১০টি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়, যা তাঁর সঙ্গীতের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

শিল্পীজীবনের পাশাপাশি মিতা হক সংগঠক ও শিক্ষক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি ‘সুরতীর্থ’ নামে একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। এছাড়া তিনি ছায়ানট সঙ্গীত বিদ্যায়তনের রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সহসভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন, যা তাঁর সাংগঠনিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করে।

সঙ্গীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একাধিক সম্মাননা অর্জন করেন। ২০১৬ সালে তিনি শিল্পকলা পদক লাভ করেন। একই বছরে বাংলা একাডেমি তাঁকে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ প্রদান করে। পাশাপাশি ‘রবি-চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা’ থেকে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়, যা তাঁর শিল্পীজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

ব্যক্তিজীবনে মিতা হক নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনেতা খালেদ খান-এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা ফারহিন খান জয়িতা।

তিনি ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের পর মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণের মাধ্যমে বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

নিচে তাঁর জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্য
জন্ম৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬২
সঙ্গীত শিক্ষাওয়াহিদুল হক, ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান, ড. সনজীদা খাতুন
আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ১১ বছর বয়সে বার্লিন শিশু উৎসব
অ্যালবাম সংখ্যামোট ২৪টি (ভারত ১৪, বাংলাদেশ ১০)
সংগঠক ভূমিকাসুরতীর্থ প্রতিষ্ঠাতা, ছায়ানট বিভাগীয় প্রধান, সম্মিলন পরিষদ সহসভাপতি
পুরস্কারশিল্পকলা পদক (২০১৬), বাংলা একাডেমি রবীন্দ্র পুরস্কার (২০১৬), রবীন্দ্রমেলা সম্মাননা
মৃত্যু১১ এপ্রিল ২০২১

মিতা হকের সঙ্গীতকর্ম ও প্রতিষ্ঠিত অবদান বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।