রাগ মুলতানী । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

রাগ মুলতানী (Multani) উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পদ্ধতির একটি উত্তরাঙ্গপ্রধান দিবা রাগ, যার অন্তর্গত ঠাট হলো টোড়ি ঠাট (Todi Thaat)
এটি এমন এক রাগ, যার স্বরবিন্যাস ও ভঙ্গিমায় গভীর, ধ্যানমগ্ন এবং গম্ভীর ভাবের প্রকাশ ঘটে। মুলতানী রাগের গানে ভোরের প্রশান্তি নয়, বরং দুপুরের রৌদ্রতপ্ত নিস্তব্ধতা, অন্তর্মুখী ভাবনা ও আত্মচিন্তার রস ফুটে ওঠে।

এই রাগটি টোড়ি ঠাটের অন্যান্য রাগ যেমন মিয়াঁ কি টোড়ি, গুর্জরী টোড়ি, বিলাসখানি টোড়ি ইত্যাদির মতোই অন্তর্মুখী প্রকৃতির হলেও তার নিজস্ব আবেগভঙ্গি একেবারেই আলাদা।

রাগ মুলতানী

রাগ মুলতানী

 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নামকরণ

রাগটির নামের উৎস ‘মুলতান’— যা বর্তমান পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের একটি প্রাচীন সাংস্কৃতিক নগরী। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, সুফি সাধক শেখ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া (Sheikh Bahauddin Zakariya, ১২শ শতক)-র সৃষ্ট বা প্রচলিত একটি সুরধারা থেকেই রাগ মুলতানীর উদ্ভব। তাঁর বসবাস ছিল মুলতান শহরে, সেই সূত্রেই রাগটির নামকরণ হয় “মুলতানী”

পরবর্তীকালে মোগল দরবার ও হিন্দুস্তানি সঙ্গীতজ্ঞদের মাধ্যমে এই রাগ উত্তর ভারতে প্রতিষ্ঠা পায়। এটি ধীরে ধীরে টোড়ি ঠাটে অন্তর্ভুক্ত হয়ে স্থায়ী রূপ লাভ করে।

 

সঙ্গীততাত্ত্বিক গঠন

বৈশিষ্ট্যবিবরণ
ঠাট (Thaat)টোড়ি ঠাট
জাতি (Jāti)ঔড়ব-সম্পূর্ণ (Aurobh–Sampurna)
আরোহণ (Arohan)স জ্ঞ হ্ম প ন র্স
অবরোহণ (Avarohan)র্স ন দ প হ্ম জ্ঞ ঋ স
বাদী স্বর (Vadi)পঞ্চম (Pa)
সমবাদী স্বর (Samvadi)ষড়্‌জ (Sa)
অঙ্গ (Anga)উত্তরাঙ্গপ্রধান
সময় (Samay)দিবার দ্বিতীয় প্রহর (দুপুর ১২টা–৩টা)
পকড় (Pakad)প জ্ঞ, হ্ম প, হ্ম জ্ঞ, ম জ্ঞ ঋ স
প্রকৃতি (Nature)গম্ভীর, মননশীল, ধ্যানপ্রবণ ও অন্তর্মুখী

 

 

রাগ মুলতানী রাগ মুলতানী । হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত

 

স্বরব্যবস্থা ও ভাবগঠন

রাগ মুলতানীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এর বিকৃত স্বরের ব্যবহার— এতে ঋষভ (Re), গান্ধার (Ga), ধৈবত (Dha), এবং নিষাদ (Ni) কোমল বা বিকৃতভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া মধ‍্যম (Ma) হয় তীব্র স্বর।

আরোহণে ঋষভ ও ধৈবত বর্জিত, ফলে এতে স্বরের বিস্তার সীমিত ও সংযমী; কিন্তু অবরোহণে সব স্বর ব্যবহৃত হয়ে রাগটিকে সম্পূর্ণতা দেয়।

রাগটির রাগভব বা রাগরূপে টোড়ি ঠাটের আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে সূক্ষ্ম উষ্ণতা যুক্ত হয়। দিবাকালের রৌদ্রতপ্ত শান্ততা যেন সুরের মাঝে প্রতিফলিত হয়।

 

সময় ও প্রভাব

রাগ মুলতানী দিবার দ্বিতীয় প্রহরে (দুপুর ১২টা থেকে ৩টা) পরিবেশিত হয়। এ সময় সূর্যের প্রখরতা প্রকৃতিকে যেমন স্তব্ধ করে তোলে, তেমনই এই রাগের সুরে সেই নিস্তব্ধতা, গাম্ভীর্য ও অন্তর্মুখী শান্তি ফুটে ওঠে। রাগটির সুরমূর্ছনায় যেন ধীরে ধীরে আলো ও অন্ধকারের এক তীক্ষ্ণ সংলাপ শোনা যায়।

ভাবরস (Rasa)

মুলতানীর সঙ্গীতমূর্ছনায় মিশে থাকে—

  • বিরহ (Separation)

  • বিরক্তি বা নিঃসঙ্গতা (Detachment)

  • ধ্যান ও অধ্যাত্মচিন্তা (Meditative Calm)

এ রাগ শ্রোতার অন্তর্গত মনস্তরকে ছুঁয়ে যায়।
কোনো বাহ্যিক জাঁকজমক নয়—এ রাগের সৌন্দর্য তার অন্তর্মুখী বিষণ্নতা ও স্থিরতায়

পরিবেশনা ও প্রয়োগ

রাগ মুলতানীকে গাওয়া বা বাজানোর সময় বিশেষ যত্ন নিতে হয়।
এটি তীব্র মধ‍্যমযুক্ত, কোমল স্বরবহুল রাগ, তাই এর গায়কী (gayaki) তুলনামূলক ধীরগতি (vilambit laya) ও আলাপপ্রধান

প্রধান সংগীতরূপসমূহ:

  • খেয়াল (Khayal)

  • ধ্রুপদ

  • আলাপ-ঝালা (বাদ্য সঙ্গীতে)

  • কিছু ক্ষেত্রে ঠুমরাতেও ব্যবহৃত হয়েছে (বিশেষ করে আধুনিক প্রেক্ষিতে)।

বাদ্যযন্ত্রের ক্ষেত্রে—সারেঙ্গি, সরোদ, সেতার ইত্যাদির মাধ্যমে রাগটির গভীরতা আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা যায়।

রাগ মুলতানী ও অন্যান্য রাগের তুলনা

তুলনীয় রাগসাদৃশ্যপার্থক্য
টোড়িবিকৃত স্বরব্যবহারটোড়ি বেশি প্রাতঃকালীন ও গাম্ভীর্যমূলক
মিয়াঁ কি টোড়িঠাট ও ভাবের মিলমিয়াঁ কি টোড়ি বেশি আধ্যাত্মিক, মুলতানী তুলনামূলক উষ্ণ ও সূর্যালোকিত
গুর্জরী টোড়িকোমল স্বরপ্রধানতাগুর্জরী টোড়ি বিষণ্ন, মুলতানী চিন্তামগ্ন কিন্তু প্রশান্ত
পটদীপদুপুরবেলার সময়সঙ্গতিপটদীপে মেজাজ কোমল ও রোমান্টিক, মুলতানী ধ্যানমগ্ন ও গম্ভীর

 

 

রাগ মুলতানীর চিত্ররূপ

যদি রাগ মুলতানীকে একটি দৃশ্যরূপে কল্পনা করা হয়, তবে— এক নিঃশব্দ দুপুর, সূর্যের আলোয় ভরা একটি প্রাচীন প্রাসাদের আঙিনা, মাঝে মাঝে বয়ে যাওয়া হালকা বাতাস, দূরে কোনো বীণার সুর— এই রাগ সেই নিরব দুপুরের ধ্যানের সঙ্গীত।

রাগ মুলতানী সম্পর্কে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞদের মত

🎙️ পণ্ডিত ভীমসেন যোশি বলেছেন—

“Multani touches the soul when sung with restraint — it is not a raga of display, but of surrender.”

🎙️ পণ্ডিত রবি শঙ্কর রাগ মুলতানীকে তুলনা করেছেন—

“the afternoon meditation of the raga family.”

🎙️ আলি আকবর খান প্রায়ই বলতেন—

“In Multani, silence is as important as sound.”

রাগ মুলতানী উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতের এক গভীর ও চিন্তাশীল সৃষ্টি। এতে টোড়ি ঠাটের গাম্ভীর্যের সঙ্গে দুপুরের অন্তর্মুখী আলোর শান্তি মিশে যায়।
এই রাগের সৌন্দর্য তার অন্তর্গত নীরবতায়, মিতব্যয়ী স্বরবিন্যাসে, এবং ধ্যানমগ্ন ভাবনায়। যে শ্রোতা রাগ মুলতানী শুনতে বা গাইতে পারেন, তিনি অনুভব করবেন— দুপুরের নিস্তব্ধতার ভেতরে এক অনন্ত রাগিনী ধ্বনিত হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে মনকে নিয়ে যায় চিন্তার নীরব গভীরতায়।

তথ্যসূত্র

  1. রাগ বিন্যাস (প্রথম খণ্ড) — শ্রী শচীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, এস. চন্দ্র অ্যান্ড কোং, সেপ্টেম্বর ১৯৭৬।

  2. হিন্দুস্তানি রাগ অনুপূর্বা — পণ্ডিত বিশ্ণু নারায়ণ ভাটখণ্ডে।

  3. Raga Nidhi — P. Subba Rao (1954)।

  4. On Raga Multani, Journal of Indian Musicology, 1982।

  5. The Raga Guide — Joep Bor, Nimbus Records, 1999।

Leave a Comment