রাধারমণ দত্ত । বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈঞ্চব বাউল, ধামালি নৃত্যের প্রবর্তক

রাধারমণ দত্ত (জন্ম: ২৬ মে, ১৮৩৩; মৃত্যু: ১০ নভেম্বর, ১৯১৫) একজন বিশিষ্ট বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল এবং ধামাইল নৃত্য-গানের প্রবর্তক। সংগীতানুরাগীদের কাছে তিনি ‘রাধারমণ’ নামেই অধিক পরিচিত। বাংলা লোকসংগীতের একজন পুরোধা হিসেবে তাঁর অবদান অমর। তাঁর রচিত ধামাইল গান সিলেট অঞ্চলসহ বাংলাদেশ এবং ভারতের বাঙালি সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং শ্রদ্ধেয়। রাধারমণ নিজের মেধা, দর্শন এবং ভক্তিময় অন্তরকে কাজে লাগিয়ে মানুষের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। কৃষ্ণবিরহের আকুতি, না-পাওয়ার ব্যথা বা সব পেয়েও না-পাওয়ার কষ্ট তাঁকে একজন সত্যিকারের সাধকে পরিণত করেছে। তিনি দেহতত্ত্ব, ভক্তিমূলক, অনুরাগ, প্রেম, ভজন, ধামাইলসহ নানা ধরনের কয়েক হাজার গান রচনা করেছেন, যা বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর গানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা এবং লোকজীবনের সরলতা ফুটে উঠেছে। তাঁর সৃষ্টি সিলেটের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এবং আজও বিয়ে-শাদি, উৎসব এবং লোকানুষ্ঠানে গাওয়া হয়। রাধারমণের গানের মাধ্যমে বাউল দর্শন এবং বৈষ্ণব ভক্তি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে, যা তাঁকে বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব করে তুলেছে।

জন্ম ও বংশ পরিচিতি

রাধারমণ দত্তের জন্ম ১৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মে (বাংলা ১২৪০ সাল) সিলেট অঞ্চলের (বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার কেশবপুর গ্রামে)। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন প্রাচীন এবং বিখ্যাত ব্রাহ্মণ বংশীয়। শ্রীহট্ট (সিলেট) অঞ্চলের পঞ্চখণ্ডে ত্রিপুরাধিপতি ‘ধর্ম ফাঁ’ কর্তৃক সপ্তম শতকে মিথিলা থেকে আনীত প্রসিদ্ধ পাঁচ ব্রাহ্মণের মধ্যে ‘আনন্দ শাস্ত্রী’ নামক বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ, যা অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ থেকে জানা যায়। আনন্দ শাস্ত্রীর প্রৌপুত্র নিধিপতি শাস্ত্রীর পুত্র ভানু নারায়ণ ছিলেন তত্কালীন মণুকুল প্রদেশে “ইটা” নামক রাজ্যের স্থপতি। ভানু নারায়ণের চার পুত্রের মধ্যে রামচন্দ্র নারায়ণ বা ব্রহ্ম নারায়ণের এক পুত্র ছিলেন প্রভাকর দত্ত।

মুঘল সেনাপতি খোয়াজ উসমান দ্বারা ইটা রাজ্য অধিকৃত হলে, এই রাজবংশের লোকেরা পালিয়ে গিয়ে আশেপাশের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেন। এ সময় প্রভাকর দত্ত তাঁর পিতার সাথে আলিসারকুল চলে যান এবং সেখানে কিছু দিন বসবাসের পর জগন্নাথপুর রাজ্যে এসে আশ্রয় নেন। কিছু দিন পর জগন্নাথপুর রাজ্যের তৎকালীন অধিপতি রাজা বিজয় সিংহের অনুমতিক্রমে প্রভাকর জগন্নাথপুরের নিকটস্থ কেশবপুর গ্রামে বাড়ি নির্মাণ করে সেখানে বসবাস করেন। পরবর্তীতে রাজা বিজয় সিংহ প্রভাকরের পুত্র সম্ভুদাস দত্তকে মন্ত্রী পদে নিয়োগ দেন। অতঃপর বানিয়াচংয়ের রাজা গোবিন্দ খাঁ বা হবিব খাঁর সাথে বিবাদে জগন্নাথপুর রাজবংশের বিপর্যয়ের কারণে রাজাশ্রিত কর্মচারীরাও দৈন্য দশায় পতিত হন। এ সময় সম্ভুদাস দত্তের পুত্র রাধামাধব দত্ত অন্যের দ্বারাস্থ না হয়ে অনন্যচিত্তে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন।

রাধামাধব দত্ত সংস্কৃত ভাষায় জয়দেবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘গীত গোবিন্দ’ বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। এছাড়া তাঁর রচিত ‘ভ্রমর গীতিকা’, ‘ভারত সাবিত্রী’, ‘সূর্যব্রত পাঁচালি’, ‘পদ্ম-পুরাণ’ ও ‘কৃষ্ণলীলা গীতিকাব্য’ উল্লেখযোগ্য। এই প্রসিদ্ধ কবি রাধামাধব দত্তই ছিলেন রাধারমণ দত্তের পিতা। রাধারমণের মা ছিলেন সুবর্ণা দেবী। তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্য সাহিত্য এবং সংগীতের সাথে গভীরভাবে যুক্ত ছিল, যা তাঁর জীবনকে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

প্রারম্ভিক জীবন এবং শিক্ষা

রাধারমণ দত্তের শৈশব কেটেছে সিলেটের গ্রামীণ পরিবেশে, যেখানে লোকসংস্কৃতি এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের প্রভাব ছিল প্রবল। তাঁর শিক্ষা গ্রামের পাঠশালায় শুরু হয়, কিন্তু সাহিত্য এবং সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল ছোটবেলা থেকেই। পিতা রাধামাধব দত্তের রচিত গ্রন্থ এবং সংগীত চর্চা তাঁকে প্রভাবিত করে। ১২৫০ বঙ্গাব্দে (প্রায় ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) পিতার মৃত্যুর পর তিনি মায়ের কাছে বড় হন। এ সময় তাঁর মধ্যে ভক্তি এবং সাধনার বীজ রোপিত হয়। তাঁর শিক্ষা সংস্কৃত, বাংলা এবং লোকসাহিত্যের উপর কেন্দ্রীভূত ছিল, যা পরবর্তীকালে তাঁর রচনায় প্রতিফলিত হয়।

বিবাহ এবং সংসার জীবন

১২৭৫ বঙ্গাব্দে (প্রায় ১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) রাধারমণ মৌলভীবাজারের আদমপাশা গ্রামের সেন শিবানন্দ বংশীয় নন্দকুমার সেন অধিকারীর কন্যা গুণময়ী দেবীকে বিবাহ করেন। এই বিবাহ তাঁর জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু করে। দম্পতির চার পুত্র ছিলেন: রাজবিহারী দত্ত, নদিয়াবিহারী দত্ত, রসিকবিহারী দত্ত এবং বিপিনবিহারী দত্ত। দুঃখের বিষয়, একমাত্র পুত্র বিপিনবিহারী দত্ত ছাড়া বাকি তিন পুত্র এবং স্ত্রী গুণময়ী দেবী অকালে মারা যান। এই শোক তাঁর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাঁকে সংসার থেকে উদাসীন করে তোলে। এই ব্যক্তিগত কষ্ট তাঁর গানে প্রেম, বিরহ এবং সাধনার অনুরণন তৈরি করে।

সাধনা, বৈরাগ্য এবং আধ্যাত্মিক যাত্রা

রাধারমণের সাধনা জীবনের শুরু হয় তাঁর শৈশব থেকেই, কিন্তু পারিবারিক শোক তাঁকে পুরোপুরি বৈরাগ্যের দিকে ঠেলে দেয়। ১২৯০ বঙ্গাব্দে (প্রায় ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে), ৫০ বছর বয়সে তিনি মৌলভীবাজার জেলার ঢেউপাশা গ্রামে সাধক রঘুনাথ ভট্টাচার্যের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই গুরুর কাছে তিনি বৈষ্ণব দর্শন এবং বাউল সাধনার গভীরতা শিখেন। গুরুর প্রভাবে তিনি গৃহত্যাগ করে জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওরের পাশে একটি আশ্রম নির্মাণ করেন। এখানে তাঁর সাধনা-ভজন চলে দীর্ঘদিন। তাঁর সাধনায় শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি নানা মতের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। তাঁর গানে দেহতত্ত্ব, ভক্তি এবং কৃষ্ণপ্রেমের মিশ্রণ দেখা যায়। সাধক রাধারমণের সাথে মরমী কবি হাসন রাজার গভীর যোগাযোগ ছিল। দুজনের মধ্যে কবিতার মাধ্যমে পত্রালাপ হতো। একবার হাসন রাজা কুশল জানতে গানের চরণ বাঁধেন: “রাধারমণ তুমি কেমন, হাছন রাজা দেখতে চায়।” উত্তরে রাধারমণ লিখেন: “কুশল তুমি আছো কেমন – জানতে চায় রাধারমণ।” এই সম্পর্ক তাঁদের সাধনাকে আরও সমৃদ্ধ করে। রাধারমণ একজন কৃষ্ণপ্রেমিক ছিলেন এবং কৃষ্ণবিরহে অসংখ্য গান রচনা করেছেন। তাঁর জীবনের শেষভাগ কেটেছে আশ্রমে সাধনা এবং গান রচনায়।

সাহিত্য এবং সংগীত কর্ম

রাধারমণ দত্তের সাহিত্যিক এবং সাঙ্গীতিক অবদান অসাধারণ। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার এবং শিল্পী ছিলেন। তাঁর রচিত গানের সংখ্যা কয়েক হাজার, যা বাউল, ধামাইল, ভক্তিগীতি, অনুরাগ, প্রেম এবং ভজন ধারায় বিভক্ত। ধামাইল গানের প্রবর্তক হিসেবে তাঁর নাম অমর। ধামাইল হলো সমবেত নারীকণ্ঠে গাওয়া গান, যা বিবাহ অনুষ্ঠানে প্রচলিত এবং সিলেট, কাছাড়, ত্রিপুরা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বিশেষ জনপ্রিয়। তাঁর ধামাইল গানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম এবং লোকজীবনের ছবি ফুটে উঠেছে। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান: “ভ্রমর কইয়ো গিয়া”, “কৃষ্ণ কি করিলো মোরে”, “রাধা রমণ কি করিলো মোরে” ইত্যাদি। তাঁর গানে লোকসুর এবং শাস্ত্রীয় সংগীতের মিশ্রণ দেখা যায়। তাঁর রচনা সিলেটি লোকসংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে এবং আজও বিবাহ, উৎসব এবং সাধনায় গাওয়া হয়। তাঁর গানের সংকলন ‘রাধারমণের ধামাইল গান’ এবং অন্যান্য গ্রন্থ আজও গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সৃষ্টি বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা (যেমন চন্দনা মজুমদার, ফরিদা পারভীন) তাঁর গান গেয়ে ঐতিহ্যকে জীবন্ত রাখছেন।

মৃত্যু এবং উত্তরাধিকার

রাধারমণ দত্ত ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ নভেম্বর (বাংলা ১৩২২ সাল) কেশবপুরে মারা যান, বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর গান এবং দর্শন সিলেট অঞ্চলে জীবন্ত থেকে যায়। সুনামগঞ্জে তাঁর স্মৃতিতে স্মারক সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। তাঁর উত্তরাধিকার হিসেবে ধামাইল গান আজও সিলেটি সংস্কৃতির অংশ। বাংলাদেশ এবং ভারতের লোকসংগীতশিল্পীরা তাঁর গান গেয়ে তাঁকে স্মরণ করেন। ২০২৪ সালে তাঁর গানের সংকলন এবং জীবনী নিয়ে নতুন গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যা তাঁর অবদানকে নতুন করে আলোকিত করছে। রাধারমণ দত্তের জীবন এবং সৃষ্টি বাংলা লোকসাহিত্যের এক অমর অধ্যায়, যা ভক্তি, প্রেম এবং সাধনার সেতুবন্ধন তৈরি করে।

Leave a Comment