লোকগানের প্রকৃত স্রষ্টা রশিদ উদ্দিনের অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই

বাংলা লোকসংগীতের বহু কালজয়ী গান যা আমরা যুগ যুগ ধরে অন্যের নামে শুনে আসছি, সেগুলোর প্রকৃত রচয়িতা হিসেবে বাউলকবি রশিদ উদ্দিনের নাম সামনে নিয়ে এসেছেন গবেষক ও নির্মাতা শাকুর মজিদ। তাঁর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘ভাটিবাংলার অধিরাজ: বাউলকবি রশিদ উদ্দিনের অধিকারহীনতার সন্ধানে’-এর বিশেষ প্রদর্শনী সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই তথ্যচিত্রটি কেবল একজন সাধকের জীবনী নয়, বরং এটি লোকসংগীতের ইতিহাসের এক বিশাল চুরির ঘটনাকে জনসমক্ষে নিয়ে এসেছে।

ইতিহাসের অন্তরালে এক মহান সাধক

১৮৮৯ সালে নেত্রকোনার বাহিরচাপড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করা রশিদ উদ্দিন ছিলেন ভাটিবাংলার বাউল জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ছিলেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম এবং কালজয়ী উকিল মুন্সির মতো মহান শিল্পীদের গুরু। অথচ তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে শাকুর মজিদ কবির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তাঁর হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপির সন্ধান পান, যা এই প্রামাণ্যচিত্রের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।

প্রামাণ্যচিত্রের তথ্য অনুযায়ী রশিদ উদ্দিনের প্রকৃত সৃষ্টিগুলো নিচে টেবিল আকারে দেওয়া হলো:

গানের শিরোনামপ্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা (যাদের নামে পরিচিত)প্রকৃত তথ্য ও প্রামাণ্যচিত্রের দাবি
এই যে দুনিয়া কিসেরও লাগিয়াআব্দুল আলীম বা লোকজ সংগহরশিদ উদ্দিনের হাতে লেখা মূল পাণ্ডুলিপি।
শুয়া চান পাখিবারী সিদ্দিকী বা উকিল মুন্সিরশিদ উদ্দিনের মৌলিক রচনা ও সুর।
মা গো মা ঝি গো ঝিসংগৃহীত বা লোকগানপারিবারিক পাণ্ডুলিপিতে প্রাপ্ত অকাট্য প্রমাণ।
দেখবে কী শুনবে কী ওরে ও মনলোকসংগীতের সাধারণ সংগহরশিদ উদ্দিনের নিজস্ব সৃজনী ও মরমী সৃষ্টি।

মেধাস্বত্ব ও বঞ্চনার আখ্যান

প্রামাণ্যচিত্রটিতে দেখা যায়, রশিদ উদ্দিনের উত্তরাধিকারীরা দীর্ঘকাল ধরে এক বুক কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন গবেষক ও শিল্পী পাণ্ডুলিপি দেখার কথা বলে কবির অমর সৃষ্টিগুলো নিয়ে গেছেন এবং পরবর্তীতে সেগুলোকে নিজেদের নামে প্রচার করেছেন। শাকুর মজিদ তাঁর এই কাজের মাধ্যমে রশিদ উদ্দিনকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা ও মেধাস্বত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, সৃজনশীল ব্যক্তির অধিকার রক্ষা করা একটি সভ্য সমাজের অন্যতম দায়িত্ব।

গুণীজনদের মূল্যায়ন ও প্রস্তাবনা

উদ্বোধনী প্রদর্শনীতে উপস্থিত থেকে সাংবাদিক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মন্তব্য করেন যে, এখন গণমাধ্যমের দায়িত্ব হলো এই সত্য প্রচার করে প্রচলিত ভুলগুলো সংশোধন করা। নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক এ কে এম মাজহারুল ইসলাম মনে করেন, এই প্রামাণ্যচিত্রটি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সারা দেশে প্রচার করা উচিত যাতে নতুন প্রজন্ম আমাদের লোকসংগীতের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে। প্রকৌশলী শাহাদাত খানও মনে করেন, এই উদ্যোগ রশিদ উদ্দিনের সৃষ্টিকর্ম সংরক্ষণে একটি নতুন যুগের সূচনা করবে।

পরিশেষে বলা যায়, ‘ভাটিবাংলার অধিরাজ’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, এটি বাংলার লোকসংস্কৃতির মূল উৎসসন্ধান এবং স্রষ্টার অধিকার রক্ষার এক জোরালো দলিল। রশিদ উদ্দিনের জীবন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এটি বাংলার অসংখ্য অখ্যাত ও বঞ্চিত স্রষ্টাদের পক্ষেই সওয়াল করছে।