লোচনের রাগতরঙ্গিনী গ্রন্থ আমাদের আলোচনার বিষয়। লোচন সপ্তদশ শতকের বিখ্যাত সঙ্গীত শাস্ত্রী ও কবি। পুরোনাম লোচন ঝা। পিতার নাম বাবু ঝা। রাগতরঙ্গীনি নামক বিখ্যাত গ্রন্থটি তারি রচনা। এ ছাড়াও লোচন রাগসঙ্গীত সংগ্রহ, নামে আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেন।
তবে এখানে একটি বিষয়ে মতভেদে রয়েছে, আরেকটি রাগতরঙ্গিনী গ্রন্থেরও অস্তিত্ব পাওয়া যায়। সেন রাজত্বের সঙ্গীতের উৎকৃষ্ট নিদর্শন বল্লাল সেনের রাজত্ব কালে রচিত লোচন শর্মার “রাগতরঙ্গিনী গ্রন্থ”। তবে দুটি “রাগতরঙ্গিণী” গ্রন্থের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে।
লোচন শর্মা বিরচিত রাগতরঙ্গিনী পুঁথি দেখে অনুমান করা হয়েছিল লোচন বহুল সেনের সমসাময়িক ছিলেন। কিন্তু, লোচনের মূল পুঁথি পাওয়া গেলে সন্দেহের অবসান হয় এবং এটি দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয় যে, গ্রন্থটি মিথিলায় অষ্টাদশ শতকের সূত্রপাতে রচিত হয়েছিল, এ সম্বন্ধে “History of Maithili Miterature” নামক গ্রন্থে অধ্যাপক জয়কান্তমিশ্র বিস্তৃতভাবে আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে, “আসলে লোচন বল্লাস সেনের সমসাময়িক হতে পারেন না। অতএব, পুনরায় প্রকাশিত পুঁথিটি সম্পর্কে একটি প্রগাঢ় রহস্য বিদ্যমান।”
লোচনের রাগতরঙ্গিনী গ্রন্থ

রাগতরঙ্গিনীতে লোচন শাস্ত্র গীতির বিস্তৃত আলোচনার অবকাশ পেয়েছেন। হনুমন্ত মতানুযায়ী ছয়রাগের বর্ণনা ছাড়াও তিনি রাগপত্নীর উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রচলিত সংকীর্ণ দেশী রাগসমূহের সবিস্তার আলোচনা করেছেন, যা ঐতিহাসিক দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ঠাট সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। ঠাটকে তিনি বলেছেন সংস্থান। তাঁর দ্বাদশ সংস্থান বা ঠাট হচ্ছে ভৈরবী, কর্ণাট, টোড়ি, গৌরী, কেনার, ইমন, সারঙ্গ, মেঘ, ধানশ্রী, পূর্বী, মুখারী ও দীপক। এছাড়াও এ গ্রন্থে স্বরসপ্তকের আলোচনা করেছেন এবং রাপরুপ পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন।
শ্রদ্ধেয় ক্ষিতিমোহন সেনের লেখা হতে জানা যায় যে, লোচনের রাগতরঙ্গিনী গ্রন্থটি বাংলাদেশে পাওয়া যায় নাই। এই গ্রন্থ হতে মধ্যভারতের রাজা হৃদয় নারায়ণ তার গ্রন্থ “হৃদয়কৌতূকে” উদ্ধৃত করেন। তবে লোচনের গ্রন্থ এলাহাবাদে পাওয়া যায় বলে অনেকেই এক মত। সৌভাগ্যবশত লোচন তার আশ্রয়দাতা বল্লাল সেনের নাম গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন তা না হলে জানাই যেত না যে, সঙ্গীত শাস্ত্রে এ আচার্য ছিলেন এই বাংলাদেশে।
বিভিন্ন তথ্যানুসারে দেখা যায় যে, লোচন পণ্ডিত শার্মদেবের পূর্ব শতাব্দীর লোক। জয়দেবের ঠিক এক পুরুষ পুর্বে লোচন এ গ্রন্থ রচনা করেন। রাগ তরঙ্গীনীর শ্রুতি, স্বরসংস্থান, গ্রাম, মেল জনক ও অন্যরাগ প্রভৃতি পরবর্তী সঙ্গীত গ্রন্থগুলিতেও অনুরূপ। ড. কর অনুমান করেন যে, প্রাচীন সঙ্গীত শাস্ত্রের মহাগ্রন্থ “সঙ্গীত ব্যাকর” ১২১০ হতে ১২৪৭ খ্রিঃ-এর মধ্যে কাশ্মিরী সঙ্গীতশাস্ত্র শাঈদের রচনা করেন।
বিভিন্ন সঙ্গীত গবেষকদের মধ্যে লোচন প্রণীত “রাগতরঙ্গিনী ” গ্রন্থের ব্যাপকতা প্রশ্নে অমিল খুঁজে পাওয়া যায়। তারপরও বাংলাগানের বিবর্তনের ক্ষেত্রে গ্রন্থখানা অনেক কিছু এনে দিয়েছে তা প্রমাণিক। লোচনশর্মা বিরচিত ‘রাগতরঙ্গিনী” গ্রন্থের সম্পাদনা ও ভাষান্তরিত করেছেন রাজ্যস্বর মিত্র। তার থেকে নাদ, মুর্ছনাগীত এর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা হলো-
নাভেরু হৃদি স্থানান্তরত প্রাণসঞ্চারণ ।
নদতি ব্রহ্মবন্ধ্যান্তে তেন নাদ ঃ প্রকীর্তিত।।
নাহির ঊর্ধ্বে হৃদিস্থান থেকে প্রাণ সংকেত বায়ু ব্রহ্মরন্ধ্রের অন্ত পর্যন্ত প্রবাহিত হয়। এই থেকে নাদ শব্দটি প্রবর্তিত হয়েছে। এই মূল তত্ত্বটিকে গ্রহণ করেই শাক্তবাদ সম্ভূত তদ্ৰবাদ সৃষ্টির মূলগত কারণকে স্পন্দনধর্মী ও উল্লাসধর্মী বলে নির্দেশ দিয়েছেন।
তন্ত্রমতে প্রকাশের মূলগত যে অবস্থা (Ultimate Reality) তাই ‘নাদ’ একান্তই স্পন্দনধর্মী। সৃষ্টি চিন্তার এই আধ্যাত্মিক বা দার্শনিক সিদ্ধান্তকে সঙ্গীত বিষয়েও প্রযুক্ত করে ভারতীয় সমস্ত প্রাচীন সঙ্গীত ‘নাদ’ কেই সঙ্গীত সৃষ্টির মূলে স্থাপন করেছেন । পরমেশ্বরকে বলা হয়েছে নাদ-তনু। অর্থাৎ ধর্ম থেকে ধর্মীকে পৃথক করা যায় না বলেই নাদ ও ব্রহ্মকে স্বধর্মযুক্ত করে একত্ববিধান করা হয়েছে।
সঙ্গীত রত্মাকর রচয়িতা বলেছেন:
নকারং প্রাণনামানং দকারং অনলং বিদুঃ
জাতঃ প্রাণাগ্নিসংযোগাতেন নাদোহবিবীয়তে।।
‘না, কার অর্থে প্রাণ বা বায়ু, ‘দ, কার অর্থে অগ্নি বা তেজ।
বায়ুত অগ্নির সংযুক্তিতেই নাদের উৎপত্তি।
ভারতীয় সঙ্গীত শাস্ত্র এই নাদকেই সঙ্গীতের প্রাচীনতম প্রকাশ বলে গ্রহণ করেছে। বিশ্বজুড়ে এই নাদেরই লীলা জড়ে, জীবনে, রূপে, অরুপে চলেছে নাদতরঙ্গেই হিল্লোল। অবশ্য ভারতীয় নাদের দুটি প্রকার আছে একটি আহতনাদ এবং অপরটি অনাহত নাদ। এই বক্তব্যের সমর্থনে স্বামী প্রজ্ঞানদ তার “ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাস” নামক গ্রন্থের ৭ পৃষ্ঠায় পাশ্চাত্য সঙ্গীত তত্ত্ববিধ সিনাইডারের যে স্মৃতিটি দিয়েছেন তা হলো-
“Primitive music is a seperate Field of its own, but to a much greater extent then art music it is bound up with everyday life and with many special factor’s psychological, sociological, religious symbolic and Linguistic ” ধ্বনিতত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় দেখা যায় যে, স্পন্দন, নির্দিষ্ট, নিয়মিত, মোলায়েম ও প্রীতিপদ হলে তবেই তাকে সাঙ্গীতিক শব্দ বলে বলা যাবে
Dr Alexandar wood
তাঁর “The physics of music গ্রন্থটিতে বলেছেন Musical sounds are smoth, regular pleasant and definite in pich” এ বিষয়ে সকল বিজ্ঞানীই একমত। সুতরাং সাঙ্গীতিক ধ্বনির রঞ্জকতা গুণটি সর্বদেশে সর্বকালেই স্বীকৃতি লাভ করেছে। সৃষ্টির অনন্ত ধ্বনি তরঙ্গের মধ্যে অতি সামান্য কয়েকটি মাত্র ধ্বনিকেই আমরা সঙ্গীতের কাজে লাগাতে পারছি।
সৃষ্টির লীলা সব ধ্বনির মধ্যে সক্রিয় থাকলেও কেবলমাত্র রঞ্জনা-নিসিক্ত শ্রাব্যধ্বনি সমষ্টিই সঙ্গীত সৃষ্টি করতে পোরেছে, অন্য ধ্বনিগুলি নয়। অনাহত নাদের বাহ্যিক প্রকাশ নেই বলেই তা সৃষ্টির তথা সঙ্গীতের উপযোগী নয়। এরূপ নাদের স্পন্দন বায়ুস্তরকে আন্দোলিত করে বায়ুস্তরের দ্বারাই বিস্তার লাভ করে শ্রবনেন্দ্রীয়কে ক্রিয়াশীল করতে পারে না বলেই মানুষের ব্যবহারিক প্রয়োজনে তাকে প্রয়োগ করা যায় না।
আজকের বিজ্ঞানও সব কারণে কারণ অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়ে Protonelectron এবং Protoplas mgene-এর এক তত্ত্বে পৌঁছে সৃষ্টির কারণ স্বরূপ যে energy বা তেজকে জেনেছে বুঝেছে সেই তেজ স্পন্দনধর্মী নাদের ধর্মের সঙ্গে তার ধর্মের কোনো প্রভেন নাই। সংখ্যাতীত আহত নাদের মধ্যে থেকে যদি একটি মাত্র নাদকে বেছে নিতে পারা যায় তবে ঠিক তার দ্বিগুণ উঁচু বা কম্পনযুক্ত নাদ পর্যন্ত যে ক্ষেত্র তাকে স্থান বা নাদস্থান বলা যাবে।
স্থান অর্থে এখানে অবস্থানকেই বোঝাচ্ছে। এই রূপ বহুসংখ্যক নাদযুক্ত এক একটি অবস্থান ক্ষেত্রকে এক একটি ইউনিট হিসাবে ধরে নিলে সংখাতীত নাদের মতোই সংখাতীত স্থানের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু মানুষের শ্রবণেন্দ্রিয়ের ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ।
বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সবচেয়ে নীচু বা মন্ত্র যে শ্রাব্য ধ্বনি তার কম্পনসংখ্যা প্রতি সেকেন্ডে ১৬টি মাত্র এবং সবচাইতে উঁচু বা তীব্র যে শ্রাব্য তার কম্পনসংখ্যা ১৬৩৮৪ (দ্রষ্টব্য: “Science and music” by James Jans, Cambridge University Press – 1953; Page-227) অর্থাৎ ১৬ হতে ১৬৩৮৪ কম্পন পরিধিই মানুষের শব্দগ্রহণ ক্ষমতার বিস্তারের পরিধি।

অতএব নাদ ব্যতীত গীত হয় না। নাদভিন্ন স্বর উত্থিত হয় না, নাদভিন্ন জ্ঞানার্জন সম্ভব হয় না এবং নাদ ব্যতীত মহলও ঘটে না।
ন নাদেন বিনা গীতং ন নাদেন বিনাস্বরঃ
না নাদেন বিনা জ্ঞানং ন নাদেন বিনা শিব :
লোচন তাঁর প্রনীত রাগতরঙ্গিনী গ্রন্থে রাগের ব্যাখ্য বিশ্লেষণকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বাহ্যিক রূপায়নকে তিনি সার্থকভাবে উপস্থাপন করেছেন। লোচনের মতে, প্রাচ্য দেশে প্রচলিত রাগ মাত্র ১২টি এবং এর প্রত্যেকটিই রাগের নাম ও লক্ষন বর্ণনা করেছেন। সেকালে যে বাংলার শারদীয় দূর্গোৎসবের পূর্বে যে আগমনী গান গীত হতো তা জানা যায় তাঁর গ্রন্থ থেকে। লোচনের সময়েও মার্গ ও দেশী -এই দুরকম পদ্ধতি প্রচলিত ছিল।
“রাগতরঙ্গিনী গ্রন্থের ভূমিকায় রাজ্যেস্বরমিত্র জানিয়েছেন যে, মিথিলার কবি লোচন ঝা সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেন (১৬৮১)। অষ্টাদশ শতকে রাজা নরপতি ঠাকুরের আদেশক্রমে ‘রাগ তরঙ্গগীতি’ এমন একটি বিখ্যাত সঙ্গীত গ্রন্থ রচনা করেন। লোচন প্রণীত ‘রাগতরঙ্গীনি’ এমন একটি গ্রন্থ যা সঙ্গীত ও সাহিত্য উভয় দিক দিয়ে মূল্যবান। বাংলার সাথে মৈথিলী পদাবলীর অন্তরঙ্গ যোগ থাকাতে গ্রন্থখানির গুরত্বও আমাদের দেশে অনেক। সাহিত্যিক মূল্যবোধে লোচনের “রাগরতঙ্গীনি” গ্রন্থ বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বহন করে আছে”।