বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রাজনৈতিক প্রচারণার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কেন্দ্র ‘হোয়াইট হাউস’-এর সাম্প্রতিক কিছু ভিডিও প্রচারণায় বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পীদের গান ব্যবহারের ধরন নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে শিল্পীদের অনুমতি ছাড়া তাঁদের সৃষ্টিকে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ও বিতর্কিত প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যবহারের ফলে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পপ তারকা সাবরিনা কার্পেন্টার থেকে শুরু করে ওলিভিয়া রদ্রিগো—অনেকেই এই ‘অনুমতিহীন’ ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
সাবরিনা কার্পেন্টারের তীব্র প্রতি বাদ
সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াইট হাউসের সামাজিক মিডিয়া কৌশল নিয়ে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় পপ গায়িকা সাবরিনা কার্পেন্টার। তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় গান ‘জুনো’ (Juno) ব্যবহার করে হোয়াইট হাউস একটি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে মূলত অভিবাসন ও শুল্ক এনফোর্সমেন্ট (ICE) কর্মীদের কার্যক্রম চিত্রায়িত করা হয়েছিল। ভিডিওটিতে দেখা যায়, আইসিই কর্মীরা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করছেন এবং তাঁদের হাতে হাতকড়া পরানো হচ্ছে।
এই ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই সাবরিনা কার্পেন্টার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) তাঁর ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি লেখেন, “এই ভিডিওটি অত্যন্ত ঘৃণ্য এবং অসভ্য। আমার গান বা আমার নাম কখনও আপনাদের এই ধরণের অমানবিক নীতির স্বপক্ষে প্রচারণার কাজে ব্যবহার করবেন না।” সাবরিনার এই কড়া জবাব বিশ্বজুড়ে তাঁর ভক্তদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় শিল্পীদের নৈতিক অধিকারের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
বিভিন্ন সময়ে শিল্পীদের অভিযোগের সংক্ষিপ্ত চিত্র
হোয়াইট হাউস এবং রাজনৈতিক প্রচারণায় অনুমতি ছাড়া গান ব্যবহারের ঘটনা এটিই প্রথম নয়। ইতিপূর্বে আরও বেশ কয়েকজন স্বনামধন্য শিল্পী একই ধরণের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন। নিচে তাঁদের তথ্যাবলী একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| শিল্পীর নাম | ব্যবহৃত গানের নাম | প্রচারণার বিষয়বস্তু | অভিযোগের ধরণ |
| সাবরিনা কার্পেন্টার | জুনো (Juno) | আইসিই (ICE) কর্মীদের ধরপাকড় অভিযান। | অমানবিক নীতির সমর্থনে অনুমতিহীন ব্যবহার। |
| ওলিভিয়া রদ্রিগো | অল-আমেরিকান বিচ | অভিবাসন নীতি সংক্রান্ত ভিডিও। | আদর্শিক অমিল ও অনুমতি ছাড়া ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। |
| কেনি লগিন্স | ডেঞ্জার জোন (Danger Zone) | ট্রাম্পের সময়কার রাজনৈতিক প্রমোশন। | বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক প্রচারণায় স্বত্ব লঙ্ঘন। |
আইনি ও নৈতিক বিতর্ক
সাধারণত যে কোনো বাণিজ্যিক বা রাজনৈতিক ভিডিওতে গান ব্যবহারের জন্য ‘সিঙ্ক লাইসেন্স’ (Sync License) বা বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু হোয়াইট হাউসের মতো প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই ‘ফেয়ার ইউজ’ বা জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে এই নিয়মগুলো এড়িয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। সংগীত বিশ্লেষকদের মতে, একজন শিল্পী অনেক পরিশ্রম করে নিজের একটি বিশেষ ভাবমূর্তি তৈরি করেন। যখন তাঁর গান এমন কোনো রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহৃত হয় যার সাথে তাঁর ব্যক্তিগত আদর্শ মেলে না, তখন সেটি শিল্পীর পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতায় আঘাত হানে।
ওলিভিয়া রদ্রিগোর ‘অল-আমেরিকান বিচ’ গানটি যখন অভিবাসন সংক্রান্ত একটি ভিডিওতে ব্যবহার করা হয়, তখন সেটি তাঁর ভক্তদের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল। একইভাবে কেনি লগিন্সের কালজয়ী গান ‘ডেঞ্জার জোন’ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। শিল্পীদের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হচ্ছে যে, হোয়াইট হাউসের মতো প্রতিষ্ঠানকে কপিরাইট এবং বৌদ্ধিক সম্পদ আইনের প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।
সংগীত কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি শিল্পীর দর্শনের প্রতিফলন। হোয়াইট হাউসের এই ধরণের কর্মকাণ্ড কেবল আইনি বিতর্ক নয়, বরং সৃজনশীল স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সাবরিনা কার্পেন্টারের এই সাহসী প্রতিবাদ হয়তো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অঙ্গনে সংগীত ব্যবহারের নীতিমালাকে আরও কঠোর করতে সাহায্য করবে। শিল্পীরা চান তাঁদের সৃষ্টি মানুষের মনে আনন্দ জোগাক, কারও প্রতি ঘৃণা বা অমানবিক নীতি প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে তা ব্যবহৃত না হোক।
