শেখ ভানু । বাংলাদেশী মরমী সাধক ও বাউল কবি

শেখ ভানু  বাংলাদেশের একজন মরমী সাধক ও বাউল গানের কবি। তার লিখা গানের সংখ্যা হাজারের কাছাকাছি। শেখ ভানুর গানের মধ্যে জনপ্রিয় অন্যতম গান হচ্ছে; (১) আমি পাড়লাম না-রে – আমার মনকে বুঝাইতে, তোমরানি দেইকাছো কেউ – কদম তলায় ফুল ফুইঠাছে (২) নিশিতে যাইও ফুল বনে-রে ভ্রমরা – নিশিতে যাইয় ফুল বনে। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে মনসুর উদ্দীন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কয়েক হাজার বাউল গান সংগ্রহ করে হারামণি ম্যাগাজিনে ১৯৪২ প্রচার করেন। শেখ ভানুর অনেকটি গান উক্ত ম্যাগাজিনে অন্তর্ভক্ত হয়েছে বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

শেখ ভানু । বাংলাদেশী মরমী সাধক ও বাউল কবি

প্রাথমিক জীবন

লাখাই উপজেলার এক নিভৃতপল্লী ভাদিকারা গ্রামে ১৮৪৯ সালে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম মুন্সি নাসির উদ্দীন। পিতার কাছ থেকেই তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তিনি লাভ করেননি। কিন্তু স্বমহিমায় তিনি পুঁথি, বারোমাসি, ত্রিপদী,পঞ্চপদী, মরমী ও কবিতা সাহিত্যে প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার রচিত আধ্যাত্মিক গানের রচনাসমূহ এক হাজারের মতো। তিনি মূলত একজন আধ্যাত্মিক সাধক।

কর্মজীবন

তার রচিত গানগুলো সুফি ঘরনার এবং সেখানে আধ্যাত্মিকতার প্রভাব স্পষ্ট। তিনি হতদরিদ্র পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান হওয়ায় ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে সংসারের হাল ধরেন। পিতার সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন ধানের কারবারে। অল্প সময়েই সততার সঙ্গে ব্যবসা করে লোকমুখে ভানু বেপারী হিসেবে পরিচিত লাভ করেন।

তার ব্যবসার ক্ষেত্র হয়ে উঠে আশুগঞ্জ, ভৈরব, মোহনগঞ্জ সহ ভাটি এলাকার আড়তসমূহ। বর্ষা মৌসুমের কোনো একদিনে ভৈরব বাজারে ধান নিয়ে নৌকায় করে নৌকার ছইয়ায় বসে যাচ্ছিলেন ভানু বেপারী। পথিমধ্যে মেঘনা নদীর চরের কানলার বাগ নামক স্থানে দেখতে পান একটি মৃতদেহকে কাক খাচ্ছে। ঘটনাটি দেখে তিনি ভাবাবিষ্ট হন। তার মনে প্রশ্ন জাগে সোনার দেহ কেন কাকে খায়। জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী সেই প্রশ্ন তাকে ভাবিয়ে তোলে।

 

নৌকার মাঝিকে নৌকাটি কোনো এক জায়গায় থামাতে বলে তিনি নেমে পড়েন এবং বলে যান মহাজনকে সবকিছু যেন বুঝিয়ে দিয়ে আসে। তিনি হাঁটতে হাঁটতে কখনো কাঁদেন, কখনো হাসেন এবং তা তার পিছু পিছু গমনকারী একজন সঙ্গী লক্ষ্য করেন। একটা সময় বাড়িতে পৌঁছে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। সুস্থ হলে আধ্যাত্মিক চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়েন এবং যোগ্য গুরুর সন্ধান করতে লাগলেন।

একসময় তিনি ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর থানাধীন কচুয়ায় সন্ধান পান মিরান শাহ তাঁতারীর। তিনি তার বাইয়্যাত গ্রহন করেন এবং আধ্যাত্ম সাধনায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি মিরান শাহের শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর অনেকটা আত্মমগ্ন ও নিভৃতচারী হয়ে পড়েন। ১৯৩৩ সালে সুসাহিত্যিক কাজী আব্দুল ওদুদের সভাপতিত্বে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনে লালন শাহ, শেখ মদন শাহ, শেখ ভানু ও হাসন রাজাকে দার্শনিক কবি হিসেবে অভিহিত করা হয়।

১৯৩৫ সালে শচীন দেব বর্মন শেখ ভানু শাহের বিখ্যাত গান ‘নিশীতে যাইও ফুল বনে রে ভ্রমরা’ গেয়ে ভারতীয় জাতীয় পুরষ্কার লাভ করেন। মূলত শচীন দেববর্মনের গাওয়ার পর গানটি জনপ্রিয়তা লাভ করে ও ছড়িয়ে পড়ে। সে গানটিতে পল্লিকবি জসীম উদ্দীনকে গীতিকার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত ভানু শাহের আধ্যাত্মিক গানটিকে পরিমার্জন করে পল্লিকবি রচনা করেন।

 

YaifwwriN4BzRFCyqbslL4 শেখ ভানু । বাংলাদেশী মরমী সাধক ও বাউল কবি

 

 

জনপ্রিয় গান

শেখ ভানু শাহের জনপ্রিয় গানগুলো হলো ১.নিশীতে যাইও ফুল বনে রে ভ্রমরা ২.আমি পারলাম না রে আমার মনকে বুঝাইতে ৩. দুই নয়নে বহে ধারা ৪. আমার মন মোহিত হইল ৫. আমারে ছাড়িয়া কোথায় যাও রে ইত্যাদি গান। তার রচিত পুঁথি ‘আশরারুল এশক ও শেখ ভানুর পুঁথি ‘ তে ভানু শাহের আধ্যাত্মবাদের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ১৯১৯ সালে ইহলীলা সংবরন করেন। তার রচিত মরমী গান গুলো বর্তমানে বিশ্ব পরিন্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে এবং ইংরেজি সহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হচ্ছে।

Leave a Comment