যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র ‘জন এফ. কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টস’-কে ঘিরে চলমান অস্থিরতা এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। বিশ্ববিখ্যাত মিউজিক্যাল ‘উইকড’ (Wicked)-এর তিনবার অস্কারজয়ী সুরকার ও গীতিকার স্টিফেন শোয়ার্টজ এবার প্রকাশ্যে এই প্রতিষ্ঠানটি বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর মতে, কেনেডি সেন্টার এখন আর অবাধ শৈল্পিক প্রকাশের নিরপেক্ষ স্থান নেই, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। এই প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তিনি আগামী মে মাসে নির্ধারিত ‘ওয়াশিংটন ন্যাশনাল অপেরা গালা’ অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আদর্শগত দ্বন্দ্ব ও শোয়ার্টজের অবস্থান
৭৭ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি শিল্পী জানিয়েছেন, কেনেডি সেন্টার তার চিরাচরিত অরাজনৈতিক ঐতিহ্য হারিয়েছে। তিনি এক ইমেইল বার্তায় স্পষ্টভাবে বলেন, “এটি এখন আর সেই নিরপেক্ষ স্থান নয় যেখানে শিল্পীরা কোনো ভয় বা পক্ষপাত ছাড়া নিজেদের প্রকাশ করতে পারতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি কোনোভাবেই সেখানে পা রাখব না।” যদিও কেনেডি সেন্টার কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে শোয়ার্টজের সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছিল না, তবে শিল্পী নিজে জানিয়েছেন যে আগের নেতৃত্বের সময় থেকেই তিনি এই অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রিত ছিলেন।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও প্রশাসনিক পরিবর্তন
কেনেডি সেন্টারের এই নজিরবিহীন সংকটের মূলে রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হস্তক্ষেপ। তিনি প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে ব্যাপক পরিবর্তন এনে নিজের অনুগত সমর্থকদের নিয়োগ দিয়েছেন এবং প্রথা ভেঙে নিজেই এই সংস্থার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এমনকি ঐতিহাসিক এই ভবনের গায়ে নিজের নাম খোদাই করার চেষ্টাও করেছেন, যা নিয়ে বর্তমানে বড় ধরনের আইনি লড়াই চলছে। অনেক আইন বিশেষজ্ঞের মতে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এই নাম পরিবর্তন সরাসরি ফেডারেল আইনের লঙ্ঘন।
শিল্পীদের গণপ্রস্থান ও বর্তমান অস্থিরতা
স্টিফেন শোয়ার্টজ একা নন, গত এক বছরে বহু নামী শিল্পী কেনেডি সেন্টার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই তালিকায় রয়েছেন ইসা রে, রিয়ানন গিডেন্স এবং বিখ্যাত মিউজিক্যাল ‘হ্যামিলটন’-এর সম্পূর্ণ দল। এছাড়া জ্যাজ ড্রামার চাক রেড বড়দিনের শো বাতিল করায় কেনেডি সেন্টারের বর্তমান প্রশাসন তাঁর বিরুদ্ধে ১০ লাখ ডলারের ক্ষতিপূরণ মামলা করার হুমকি দিয়েছে।
কেনেডি সেন্টারের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র:
| মানদণ্ড | বিস্তারিত তথ্য |
| বর্জনকারী প্রধান শিল্পী | স্টিফেন শোয়ার্টজ, ইসা রে, বেন ফোল্ডস, রেনি ফ্লেমিং |
| মূল বিতর্ক | ট্রাম্পের চেয়ারম্যান পদ গ্রহণ ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ |
| আইনি সংকট | কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়া ভবনে ট্রাম্পের নাম যোগ করা |
| দর্শক পরিসংখ্যান | গত বছরের তুলনায় ভিউয়ারশিপ ২৬% হ্রাস পেয়েছে |
| সর্বশেষ দর্শক সংখ্যা | ৪.১ মিলিয়ন (ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন রেটিং) |
| কর্তৃপক্ষের হুমকি | শো বাতিলকারী শিল্পীদের বিরুদ্ধে ১ মিলিয়ন ডলারের মামলা |
রেটিং বিপর্যয় ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
কেবল শিল্পীরাই নন, সাধারণ দর্শকদের মধ্যেও কেনেডি সেন্টারের অনুষ্ঠানের প্রতি ব্যাপক অনাগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। গত ডিসেম্বরে ট্রাম্পের সঞ্চালনায় প্রচারিত ‘কেনেডি সেন্টার অনার্স’ অনুষ্ঠানটির রেটিং ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। নিলসেনের তথ্য অনুযায়ী, দর্শক সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ২৬ শতাংশ কমে ৪.১ মিলিয়নে ঠেকেছে। যদিও হোয়াইট হাউস এবং কেনেডি সেন্টার কর্তৃপক্ষ একে ‘সাফল্য’ হিসেবে দাবি করছে, কিন্তু শিল্পীদের ধারাবাহিক বর্জন আমেরিকার এই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভবিষ্যৎকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
