ভারতীয় সঙ্গীতের ইতিহাসে বৈদিক যুগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ যুগের সূচনা ধরা হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টীয় ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত সময়কে। এই দীর্ঘ সময়কালকে সাধারণত অতিপ্রাচীন ও প্রাচীন বৈদিক যুগ নামে অভিহিত করা হয়। এই সময়েই ভারতীয় আর্যগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন ও কাব্যকলায় এক অনন্য উচ্চতায় উপনীত হয়েছিলেন।
Table of Contents
সঙ্গীতের বৈদিক যুগ | সঙ্গীতের ইতিহাস
📖 বৈদিক জ্ঞান ও ভারতবর্ষ
এই যুগকে সমগ্র বিশ্বের জ্ঞান-বিকাশের উৎস বলা হয়ে থাকে। বহু পণ্ডিত মনে করেন, ভারতবাসীরাই তাঁদের জ্ঞান ও সংস্কৃতি দিয়ে বিভিন্ন জাতিকে দীক্ষিত করেছিলেন শান্তি ও মিলনের মন্ত্রে। এর ফলে ভারতবর্ষ হয়ে উঠেছিল সভ্যতা ও সংস্কৃতির আদিভূমি।
প্রখ্যাত শিল্পতত্ত্ববিদ E. B. Havell তাঁর The Ideals of Indian Art (1920) গ্রন্থে লিখেছেন:
“It is a profound mistake to regard the Indian Aryans as an uncreative or inartistic race; for it was Aryans’ philosophy, which makes all India one today, that synthesised all the foreign influences which every invader brought from outside and moulded them to its own ideals.”
অন্যদিকে, বিখ্যাত জার্মান পণ্ডিত Max Müller ১৮৮৯ সালের Gifford Lectures এ বলেন:
“Whether the Vedic hymns were composed 1000 or 1500 or 2000 or 3000 B.C., no power on earth will ever determine…”
তিনি আরও বলেন:
“It may be very brave to postulate 2000 B.C., or even 5000 B.C., as a minimum date for the Vedic hymns, but what is gained by such bravery? Whatever may be the date of the Vedic hymns — whether 1500 or 15000 B.C. — they have their own unique place and stand by themselves in the literature of the world.” (Indian Philosophy, 1912)
🕉️ আর্য ও বেদরচনার কাল
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, বেদের মন্ত্রসমূহকে পরমেশ্বরের বাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে ইতিহাস ও গবেষণার নিরিখে, বিশেষজ্ঞদের অভিমত যে এই মন্ত্রসমূহ মূলত বিভিন্ন ঋষি ও মনীষীদের রচনা। বেদের দেবতাদের নামের প্রাচীন উল্লেখ ও আচারবিধি দেখে অনেকে এই ধর্মীয় রূপকথার জন্ম দিয়েছেন।
অনুমান করা হয়, এই আর্যগণই সিন্ধু উপত্যকার হরপ্পা, মহেঞ্জোদড়ো, ঝুকর, চন্নদড়ো প্রভৃতি নগরসভ্যতার স্থপতি ছিলেন। তাঁরা উন্নত স্থাপত্য, চিত্রকলা, কৃষ্টিকৌশল ও সঙ্গীতচর্চার মাধ্যমে একটি অনন্য সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।
⏳ রচনাকালের মতানৈক্য
বেদচতুষ্টয়ের রচনাকাল নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে এখনো যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে:
- কেউ বলেন, এটি খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে রচিত।
- কেউ বলেন, খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দে।
- কেউ কেউ মনে করেন, এ রচনা তারও বহু পূর্বের।
এই মতানৈক্যের মধ্যে Max Müller-এর উক্তিগুলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ তিনি সময়কালকে নির্ধারিত করে না দিয়ে বেদের অতুলনীয় সাহিত্যিক ও দার্শনিক গুরুত্বকে তুলে ধরেন।
🧱 পুরাতাত্ত্বিক সূত্র ও সঙ্গীতচর্চার ধারা
যেসব পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন খননের মাধ্যমে সিন্ধু সভ্যতা থেকে পাওয়া গেছে, সেগুলোর সঙ্গে বেদের রচনাকালের একটি যোগসূত্র অনেক গবেষকই শনাক্ত করেছেন। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, ভারতীয় সঙ্গীত ও ধ্বনির দর্শন খুব সম্ভবত বৈদিক যুগ থেকেই শুরু হয়েছিল — যার ধারা আজও বহমান।
📚 বৈদিক গ্রন্থ ও জ্ঞানতত্ত্ব: সংহিতা থেকে দর্শন পর্যন্ত
বৈদিক যুগে প্রাচীন ঋষিগণ যে বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার রচনা করেছিলেন, তাকে সামগ্রিকভাবে বৈদিক সাহিত্য বলা হয়। এই সাহিত্যকে প্রধানত চারটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে: সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। পরবর্তীকালে এদের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে বেদাঙ্গ, স্মৃতিশাস্ত্র এবং ষড়দর্শন, যা একে একে ভারতীয় দর্শন ও জীবনের প্রতিটি শাখায় প্রভাব বিস্তার করে।
১️⃣ সংহিতা: বেদের মূল অংশ
বেদের চারটি ভাগ—ঋক্, যজুঃ, সাম ও অথর্ব—এই চারটিকে একত্রে সংহিতা বলা হয়। এগুলো ভারতীয় সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন।
- ঋগ্বেদ: দেবতা ও প্রকৃতির স্তোত্রে পূর্ণ; প্রাচীনতম সংহিতা।
- যজুর্বেদ: যজ্ঞ ও ধর্মীয় আচারানুষ্ঠানের মন্ত্র সংকলন।
- সামবেদ: ঋকের নির্বাচিত শ্লোকগুলিকে সুরে গাওয়ার জন্য রচিত।
- অথর্ববেদ: রহস্যময় মন্ত্র, রক্ষা ও রোগ নিরাময়ের উপাদান সমৃদ্ধ।
‘ত্রয়ী’ শব্দটি প্রাচীন গ্রন্থে ঋক, যজুঃ ও সাম এই তিন বেদকেই নির্দেশ করলেও আজ অধিকাংশ পণ্ডিত অথর্ববেদকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
২️⃣ ব্রাহ্মণ: আচার ও মন্ত্রের ব্যাখ্যা
প্রত্যেক বেদের সঙ্গে যুক্ত ব্যাখ্যামূলক সাহিত্যের নাম ব্রাহ্মণ। এতে ধর্মীয় আচার, যজ্ঞ, ব্রত ও উৎসবের পদ্ধতি ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যাজ্ঞিক জীবনের পূর্ণ নির্দেশিকা হিসেবে এই সাহিত্য বিবেচিত।
৩️⃣ আরণ্যক: দার্শনিক চিন্তার সূত্রপাত
ব্রাহ্মণের শেষাংশ, যা অরণ্যবাসী ঋষিদের উদ্দেশে রচিত, তাকে আরণ্যক বলা হয়। এখানে আচারগত নিয়মের পরিবর্তে দার্শনিক বিশ্লেষণ ও ধ্যানধারণার প্রতি বেশি জোর দেওয়া হয়েছে।
4️⃣ উপনিষদ বা বেদান্ত: চূড়ান্ত জ্ঞান ও আত্মতত্ত্ব
উপনিষদ হল আধ্যাত্মিক ও আত্মজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যের শীর্ষ। এটি আরণ্যকের চিন্তার গভীরে পৌঁছে জীবনের মৌলিক প্রশ্নের উত্তর সন্ধান করে। “ব্রহ্ম কি?”, “আত্মা কী?”, এইসব মূল প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানে উপনিষদ অনন্য। এ কারণেই এগুলিকে বলা হয় বেদের অন্ত বা বেদান্ত।
🧠 বেদাঙ্গ: বেদপাঠ ও ধর্মীয় আচারবিধির ছয় অনুষঙ্গ
বেদের যথাযথ পাঠ ও ব্যাখ্যার জন্য ছয়টি সহায়ক শাস্ত্র বা বেদাঙ্গ রচিত হয়েছিল:
- শিক্ষা – উচ্চারণ বিদ্যা
- ছন্দ – ছন্দ ও মিটার
- ব্যাকরণ – ভাষার শুদ্ধতা (যেমন পাণিনি)
- নিরুক্ত – শব্দতত্ত্ব ও ব্যুৎপত্তি
- জ্যোতিষ – ধর্মীয় কালের গণনা
- কল্প – যজ্ঞ ও আচারসংক্রান্ত নিয়ম
কল্পসূত্র আবার বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত:
- শ্রৌতসূত্র: যজ্ঞবিধি
- গৃহ্যসূত্র: পারিবারিক আচার
- শুল্বসূত্র: যজ্ঞবেদীর জ্যামিতি
- ধর্মসূত্র: সামাজিক ও আইনগত বিধান
এই সূত্রগুলোর উপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে মনুসংহিতা, যাজ্ঞবল্ক্যসংহিতা ইত্যাদি রচিত হয়।
🧘♂️ ষড়দর্শন: ছয়টি দার্শনিক পথ
ভারতীয় দর্শনের মৌলভিত্তি তৈরি হয় এই ছয়টি দর্শন বা “ষড়দর্শন” এর মাধ্যমে:
- সাংখ্য (কপিল) – বাস্তব জগত ও পুরুষ-প্রকৃতি বিশ্লেষণ
- যোগ (পতঞ্জলি) – চিত্তনিয়ন্ত্রণ ও ধ্যানচর্চা
- ন্যায় (গৌতম) – যুক্তি ও তর্কবিদ্যা
- বৈশেষিক (কণাদ) – বস্তুতত্ত্ব
- পূর্বমীমাংসা (জৈমিনি) – যজ্ঞের তাৎপর্য
- উত্তরমীমাংসা / বেদান্ত (ব্যাস) – আত্মা, ব্রহ্ম ও মুক্তি
📜 স্মৃতি, শাস্ত্র ও বহুমুখী জ্ঞানচর্চা
ব্রাহ্মণ সাহিত্যে পুরোহিতদের উপস্থিতি এবং যজ্ঞকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা গভীরভাবে যুক্ত ছিল। পরে এই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে রচিত হয় ধর্মসূত্র ও স্মৃতিশাস্ত্র, যেগুলো থেকেই জন্ম নেয়:
- আয়ুর্বেদ (স্বাস্থ্যবিদ্যা)
- অর্থশাস্ত্র (রাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি)
- সংগীতশাস্ত্র, নাট্যশাস্ত্র, স্থাপত্যবিদ্যা, হস্তিশাস্ত্র, ধনুর্বেদ, কামশাস্ত্র ইত্যাদি।
এই বিস্তৃত জ্ঞানতত্ত্ব বেদ চতুষ্টয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এবং আজও তা ভারতীয় সভ্যতার মৌলিক রূপরেখা রূপে বিবেচিত।
🎵 গীতশ্রেণী ও স্বরের বিবর্তন: বৈদিক যুগে সংগীতচর্চার বিশদ রূপরেখা
গীতশ্রেণী: স্বরের পরিসরে গানের শ্রেণিবিন্যাস
বৈদিক সংগীতে প্রাথমিকভাবে তিন থেকে পাঁচটি স্বর ব্যবহৃত হলেও, কালের প্রবাহে ছয় ও সাত স্বরযুক্ত সামগান-এরও উদ্ভব ঘটে। প্রাচীন ঋষিরা গানগুলিকে স্বরের সংখ্যার ভিত্তিতে শ্রেণিবদ্ধ করেছিলেন, যাকে বলা হয় গীতশ্রেণী।
পাণিনীর শিক্ষায় এই শ্রেণিবিন্যাসের উল্লেখ আছে:
“Ārtika Gāthikaścaiva Sāmikaśca svarāntaraḥ |
Oḍuvaṁ ṣāḍavaścaiva Sampūrṇaśceti saptamaḥ ||”
এই ধারাটি ব্যাখ্যা করে নারদী শিক্ষায় বলা হয়েছে:
“Eka-svara prayogo hi Ārtika so’bhidhīyate
Gāthiko dvi-svaro jñeyaḥ Tri-svaraścaiva Sāmikaḥ
Catuḥ-svara prayogo hi Kathitastu svarāntaraḥ
Oḍuvaṁ pañcabhiscaiva Ṣāḍavaḥ ṣaṭ-svaro bhavet
Sampūrṇaḥ sapta-bhiscaiva Vijñeyaḥ gīta-śoktribhiḥ ||”
অর্থাৎ:
- Ārtika – এক স্বরের গান
- Gāthika – দুই স্বরের
- Sāmika – তিন স্বরের
- Svarāntara – চার স্বরের
- Oḍuva (Audava) – পাঁচ স্বরের
- Ṣāḍava – ছয় স্বরের
- Sampūrṇa – সাত স্বরের গান
এই সাত শ্রেণির গানের প্রচলনই বৈদিক সংগীতের মূলধারা তৈরি করে।
বৈদিক স্বরের প্রকৃতি ও নাম
বৈদিক যুগে স্বরের পরিচয় ছিল কিছুটা ভিন্ন। সাতটি স্বরকে সেখানে বলা হতো:
- Kruṣṭa
- Prathama
- Dvitīya
- Tṛtīya
- Caturtha
- Mandra
- Atisvārya
পাণিনীর শিক্ষায় আবার লৌকিক সাতটি স্বর এবং তাদের তিনটি স্থানে বিভাজনেরও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়:
“Udātte – Ni, Ga
Anudātte – Ri, Dha
Svarita – Sa, Ma, Pa”
এখানে তিনটি স্তর বা স্থানে (Mandra, Madhya, Tār) স্বরবিন্যাসের বর্ণনা পাওয়া যায়।
‘যম’ বা স্বর নির্দেশক শব্দ
ঋষি শৌনক স্বরকে চিহ্নিত করতে “যম” শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন।
“Triṣu Mandrādiṣu sthāneṣu ekaikasmin sapta sapta yamāḥ bhavanti.”
অর্থাৎ তিনটি স্থানে (মন্দ্র, মধ্য, তার) প্রতিটিতে সাতটি করে ‘যম’ বা স্বর রয়েছে।
ঋষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে ‘যম’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত ও আধ্যাত্মিক অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন:
“Ahiṁsā satya asteya brahmacarya aparigrahaḥ yamāḥ”
যার মানে— অহিংসা, সত্যবাদিতা, চুরি না করা, ব্রহ্মচর্য পালন এবং অহম-ত্যাগ। অর্থাৎ ‘যম’ মানেই নিয়ন্ত্রক নীতি, এবং সংগীতে যম মানে স্বরের যথার্থ নিয়ন্ত্রণ।
স্বরমণ্ডল: সংগীতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
বৈদিক যুগের কিছু পরেই সংগীতে যে সংগঠিত কাঠামো গড়ে ওঠে তাকে বলা হয় স্বরমণ্ডল। নারদী শিক্ষায় এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে:
“Saptasvarās-trayo grāmāḥ, Mūrchanāḥ ekaviṁśati
Tānāḥ ekonapañcāśat, iti tat svaramaṇḍalam ||”
অর্থাৎ:
- ৭টি স্বর
- ৩টি গ্রাম (মূলস্বরবিন্যাস পদ্ধতি)
- ২১টি মূর্ছনা (স্বর পরিবর্তনের ধারা)
- ৫১টি তান (স্বর আন্দোলন)
এই সংমিশ্রণ গড়ে তোলে স্বরমণ্ডল, যা ছিল বৈদিক সংগীতের মৌল কাঠামো।
সংগীতচর্চার বিভিন্ন স্তর
ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ ও অথর্ববেদ, ব্রাহ্মণ সাহিত্য, শিক্ষা ও প্রাতিশাখ্য, পাণিনী, যাস্ক, শৌনক—এদের সকলের রচনায় আমরা সংগীতের প্রাচীনতম এবং গভীরতম রূপ খুঁজে পাই। তারা শুধু সংগীতকে আচার ও ধর্মীয় রীতির সঙ্গে যুক্ত করেননি, বরং একে একটি বিজ্ঞান ও দর্শনের শাখা হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
