সঙ্গীতে গীতিকার (ইংরেজি: Lyricist) হলেন সেই সৃজনশীল লেখক, যিনি গানের কথা বা লিরিক্স রচনা করেন। গীতিকাররা প্রায়ই গীতিকবি হিসেবেও পরিচিত, কারণ তাঁদের রচনা কবিতার মতো ছন্দ, ভাব, আবেগ ও চিত্রকল্পে সমৃদ্ধ। সঙ্গীতের জগতে গীতিকারের ভূমিকা অত্যন্ত মৌলিক—কারণ গানের আত্মা তার কথায় নিহিত। গীতিকারের লিখিত গীত থেকেই সুরকার সুর সৃষ্টি করেন, সঙ্গীত পরিচালক অ্যারেঞ্জমেন্ট করেন এবং শিল্পীরা কণ্ঠ দিয়ে তা জীবন্ত করে তোলেন। একটি গানের সফলতা অনেকাংশে গীতিকারের কথার উপর নির্ভর করে, যা শ্রোতার মনে গভীর ছাপ ফেলে এবং আবেগ জাগায়।
সঙ্গীতে গীতিকারের কাজ শুধু কথা লেখা নয়—তাঁকে ছন্দ (মিটার), রাইম (অন্ত্যমিল), ভাষার সৌন্দর্য, গল্প বলার কৌশল এবং সুরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হয়। বাংলা সঙ্গীতে গীতিকাররা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কবি থেকে অনুপ্রাণিত, যাঁরা গানকে সাহিত্যের অংশ করে তুলেছেন।
Table of Contents
গীতিকার-সুরকার
যখন একজন গীতিকার নিজেই গানের কথা লিখে সুর সৃষ্টি করেন, তাঁকে গীতিকার-সুরকার বলা হয়। এখানে তিনি কথা রচনার পর বাদ্যযন্ত্র যেমন বেহালা, তবলা, কীবোর্ড, গিটার, হারমোনিয়াম বা ইলেকট্রনিক যন্ত্র ব্যবহার করে সুর বাঁধেন। এই ধরনের গীতিকাররা স্বাধীনভাবে কাজ করেন এবং গানের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেন। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে হাবিব ওয়াহিদ বা ইমরান মাহমুদুলের মতো শিল্পীরা প্রায়ই কথা লিখে সুরও করেন। এতে সৃজনশীলতা আরও গভীর হয়, কারণ কথা ও সুর একই মন থেকে উৎসারিত।
গীতিকার-শিল্পী
যখন গীতিকার নিজের লিখিত গানে কণ্ঠ দেন, তাঁকে গীতিকার-শিল্পী বলা হয়। এখানে তিনি অন্য সুরকার বা সঙ্গীত পরিচালকের সহায়তায় গান গান। এই ধরনের শিল্পীরা কথার আবেগকে নিজের কণ্ঠে ফুটিয়ে তোলেন, যা গানকে আরও ব্যক্তিগত করে। বাংলাদেশে আইয়ুব বাচ্চু বা জেমসের মতো রক তারকারা প্রায়ই নিজের গান লিখে গান। এতে শিল্পীর ব্যক্তিত্ব গানের সঙ্গে মিশে যায়।
সহযোগী গীতিকার
যখন একটি গানের কথা দুই বা তার বেশি গীতিকার মিলে রচনা করেন, তাঁদের সহযোগী গীতিকার বলা হয়। এতে একজন মূল কথা লিখতে পারেন, অন্যজন পরিমার্জনা বা অতিরিক্ত অংশ যোগ করেন। এই সহযোগিতা গানকে আরও সমৃদ্ধ করে, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মিশ্রণ ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, চলচ্চিত্রে প্রায়ই দুজন গীতিকার একসঙ্গে কাজ করেন।
কবিয়াল
বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতে গীতিকারদের কবিয়াল বলা হয়। কবিয়ালরা লোকগান যেমন ভাটিয়ালী, বাউল, মুর্শিদি বা ভাওয়াইয়া গানের কথা রচনা করেন। তাঁরা প্রকৃতি, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও সমাজের কথা গানে তুলে ধরেন। বিখ্যাত কবিয়াল যেমন রাধারমণ দত্ত বা শাহ আব্দুল করিমের মতো লোককবিরা এই ঐতিহ্যের প্রতিনিধি।
গীতিকারের গুরুত্ব
গীতিকাররা সঙ্গীতের ‘কবি’—তাঁরা শব্দের মাধ্যমে আবেগ, গল্প ও সমাজের প্রতিফলন ঘটান। আইনগতভাবে, একটি গানের কপিরাইটে গীতিকার সুরকারের সঙ্গে সমান অধিকারী। বাংলাদেশে গীতিকাররা চলচ্চিত্র, আধুনিক গান, লোকসঙ্গীত ও পপে অবদান রেখেছেন। তাঁদের কাজ নজরুলের বিদ্রোহী গান থেকে আধুনিক পপ পর্যন্ত বিস্তৃত।
বাংলাদেশী গীতিকারের তালিকা
বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে অসংখ্য গীতিকার রয়েছেন, যাঁরা লোক থেকে চলচ্চিত্র পর্যন্ত সব ধারায় অবদান রেখেছেন। নীচে কয়েকজন বিখ্যাতের নাম দেওয়া হলো (বর্ণানুক্রমিকভাবে সাজানো):
- আজাদ রহমান — চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানের গীতিকার।
- আবু বকর সিদ্দিক — লোকসঙ্গীত ও চলচ্চিত্রে অবদান।
- আল মাহমুদ — কবি ও গীতিকার, আধুনিক বাংলা গানে।
- গাজী মাজহারুল আনোয়ার — চলচ্চিত্রের অনেক হিট গানের গীতিকার (যেমন ‘ওরে নীল দরিয়া’)।
- জীবন চৌধুরী — লোক ও আধুনিক গান।
- জহির রায়হান — কবি-গীতিকার।
- তালিম হোসেন — প্রারম্ভিক যুগের গীতিকার।
- নজরুল ইসলাম বাবু — চলচ্চিত্র গান।
- পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় — বাংলাদেশ-ভারতের প্রভাবিত, আবেগময় গান।
- মনিরুজ্জামান মনির — আধুনিক ও চলচ্চিত্র গান।
- শেখ সাদী খান — লোক ও পপ।
- সাইফুল্লাহ মানিক — সমসাময়িক গীতিকার।
- হায়দার আনোয়ার — চলচ্চিত্রের বিখ্যাত গান।
এই তালিকা অসম্পূর্ণ—বাংলাদেশে হাজারো গীতিকার রয়েছেন। পরের পর্বে বিস্তারিত জীবনী নিয়ে আলোচনা করব। আপনার প্রিয় গীতিকার কে?