সমরেশ বসু: রাজনৈতিক সংগ্রামী ও সাহিত্যের চিরন্তন রত্ন

সমরেশ বসু বাংলা সাহিত্যের এক অদ্বিতীয়, প্রথাভাঙা এবং শক্তিশালী লেখক। তাঁর সাহিত্যকর্মে দেখা যায় জীবন, সমাজচেতন, শ্রমিক রাজনীতি, ভ্রমণ এবং মানুষের অন্তর্গত আবেগের অনন্য সমন্বয়। ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৯ সালের মধ্যে তিনি ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরিতে কর্মরত ছিলেন। সেই সময়েই তিনি ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। এই রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে ১৯৪৯-৫০ সালে তাকে কারাবাস ভোগ করতে হয়। কিন্তু সেই কঠোর সময়টাই বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অসামান্য আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করে। কারাগারের নীরবতা এবং অন্ধকারের মধ্যে তিনি রচনা করেন তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘উত্তরঙ্গ’। মুক্তির পরই সাহিত্য তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে।

সমরেশ বসু জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর কলকাতায়। শৈশব কেটেছে বাংলাদেশের বিক্রমপুরে এবং কৈশোর কেটেছে নৈহাটির অলি-গলিতে। দারিদ্র্য, সংগ্রাম এবং শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে মিশে থাকা তাঁর চেতনা, পরবর্তীতে সাহিত্যকর্মে জীবনের প্রকৃতির বাস্তব প্রতিফলন ঘটায়। জীবিকার তাগিদে একসময় মাথায় ঝুড়ি নিয়ে ডিম বিক্রি করা সেই শিশু পরিণত হয় বাংলা সাহিত্যের অমর কথাশিল্পীতে।

সমরেশ বসু ছিলেন অভিজ্ঞতা-নির্ভর রচনার জাদুকর। শ্রমজীবী মানুষের জীবন, রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্তরঙ্গতা, যৌনতা এবং সমাজের বহুমাত্রিক টানাপোড়েন—সবই তিনি সাহসী ও শিল্পসম্মত ভাষায় প্রকাশ করেছেন। তাঁর দুটি ছদ্মনাম ছিল কালকূট ও ভ্রমর। ‘কালকূট’ ছদ্মনামে তিনি লিখেছেন অসংখ্য বিখ্যাত উপন্যাস, যেমন—অমৃত কুম্ভের সন্ধানে, কোথায় পাব তারে, অমৃত বিষের পাত্রে, মন মেরামতের আশায়, এবং তুষার-শৃঙ্গের পদতলে। এই সাহিত্যকর্মগুলোতে জীবনযাত্রার দুঃখ, যন্ত্রণা এবং সত্যের সন্ধান অনন্য শিল্পমাধ্যমে ফুটে উঠেছে। ‘কালকূট’-এর অগ্নিমধ্যে তিনি যেন নিজেকেই ঢেলে দিয়েছেন, যার ফলে তাঁর লেখা তীব্র, রূক্ষ, তবু গভীরভাবে মানবিক হয়ে ওঠে। ১৯৮০ সালে ছদ্মনামে রচিত রচনার জন্য তিনি সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

শিশুসাহিত্যে তাঁর সৃষ্টি ‘গোগোল’ রহস্যপ্রিয়, কৌতূহলময় এবং দুঃসাহসী এক বালক চরিত্র হিসেবে আজও পাঠকের প্রিয়। সমরেশ বসুর রচনা সংখ্যা ছিল বিপুল—গল্পের সংখ্যা ২০০-এর বেশি, এবং উপন্যাস ১০০-এরও বেশি। এই বিশাল সৃষ্টিসমূহে বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব ধারাই নতুন রূপে ফুটে উঠেছে।

১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ, বাংলা সাহিত্য এক মহান সাহিত্যিককে হারায়। তবু সমরেশ বসুর লেখা আজও পাঠকের হৃদয়ে সজীব। শ্রমিকের ঘামে, পথিকের ধুলায়, মানুষের আবেগে এবং জীবনের তীব্র সত্যে তিনি আজও বেঁচে আছেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের অমর রত্ন হিসেবে চিরকালই জীবন্ত থাকবে।