সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান: সকালে রোজ গঙ্গাস্নান করতেন। দিনে পাঁচ বার নমাজ পড়তেন। তার পর সন্ধ্যায় রোজ বালাজি মন্দিরের চাতালে রেওয়াজ করতেন। কখনও দাঁড়িয়ে সানাই বাজাতেন না। শুধু বছরে এক দিন। মহরমের দিন। ওই একটা দিন তিনি রাস্তায় বেরিয়ে কোনও রাগ বাজাতেন না, বাজাতেন বিলাতগীতি নৌহা | প্রতিটি অনুষ্ঠানে ‘রঘুপতি রাঘব’ অবধারিত ছিল। রাধাকৃষ্ণের লীলা পরিবেশন করতে করতে তিনি বলতেন, ‘বাজাতে বাজাতে মনটা আমার বৃন্দাবনে চলে যায়।’ সঙ্গীত, সুরের সেই পরিবেশন তখন আর শুধু পারফরম্যান্স থাকত না, হয়ে উঠত মানবদর্শন। শৈশবের কথা বলতে গিয়ে বলতেন,’ প্রতিদিন ভোরবেলা গঙ্গায় স্নান করে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তাম।তারপর বালাজি মন্দিরে গিয়ে সারাদিন সানাই বাজাতাম।কই, কোনোদিন তো অসুবিধা হয়নি।’
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান
ব্রিটিশ ভারতে গোঁড়া মুসলিম পরিবারে জন্ম | জন্মদত্ত নাম ‘কামরুদ্দিন’। কিন্তু পুত্রসন্তান হওয়ায় সানাইবাদক ঠাকুরদা বলে ফেলেন, ‘‘বিসমিল্লা !’’ অর্থাৎ, আল্লাহর নামে। সেই থেকেই তিনি ‘বিসমিল্লা’। মাত্র ৬ বছর বয়সে বারাণসীতে চলে এসেছিলেন। মামা আলি বক্স ‘বিলায়েতু’ খান ছিলেন কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাইবাদক। তাঁর কাছেই সানাই শেখা শুরু বিসমিল্লার। তাঁর সঙ্গে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ‘ইলাহাবাদ মিউজিক কনফারেন্স’-এ যান কিশোর সানাইবাদক বিসমিল্লা।
স্বাধীনতার পর প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবস। জওহরলাল নেহেরু ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করলেন প্রজাতন্ত্র দিবসের পদযাত্রায় সানাই বাজানোর জন্য। প্রথমেই নাকচ করে দিলেন।’–একমাত্র মহরমের দিন ছাড়া আমি দাঁড়িয়ে সানাই বাজাই না।’ নেহেরু দিনটির গুরুত্ব বুঝিয়ে আবার অনুরোধ করায় রাজি হলেন। খাঁ সাহেব ভাবনায় পড়লেন, কী বাজানো যায় ! হঠাৎ বেনারসের ঘাটে মাঝিদের গানের সুর কানে এল। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে ফেললেন কী সুর বাজাবেন। সেদিন বাজালেন ‘গঙ্গা দুয়ারে বানাইয়া বাজে’। সানাইয়ের সুরে সেদিন দেশবাসীর কাছে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের মেঠো সুর পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।
৯২ বছর বয়সে প্রয়াত হন বিসমিল্লাহ্ খান। তাঁর প্রয়াণে একদিন জাতীয় শোক ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। তাঁর নশ্বর দেহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল বারাণসীর ফতেহমান গোরস্থানে। ভারতীয় সেনা একুশ তোপধ্বনিতে বিদায় জানিয়েছিল বৃদ্ধ সানাইবাদককে। বিসমিল্লার সঙ্গেই মাটি দেওয়া হয়েছিল তাঁর প্রিয় একটি সানাইকেও। তিনি নিজে বলতেন, ‘বিভিন্ন ঘরানা থেকে ফুল তুলে এনে আমার সানাইয়ে ভরে দিই। তৈরি হয় গুলদস্তা।’

সুরসম্রাট বিসমিল্লা খাঁ-র প্রয়াণদিবসে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য |
– অহর্নিশ
তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা, গৌতম ঘোষের স্মৃতিচারণ