বাংলাদেশের সংগীতজগতে একসময় উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল কণ্ঠশিল্পী মাহাদী ফয়সালের। বিশেষ করে “তুমি বরুণা হলে হব আমি সুনীল” গানটির সুবাদে তিনি ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। পরে “মেঘ হয়ে কাঁদো বলে”, “মালিক রব্বানা”, “কত কাছে তোমার”—এমন আরও কয়েকটি গান তাঁকে মূলধারার শ্রোতাদের কাছে পরিচিতি এনে দেয়। বেশ কিছু বছর মিডিয়ার চোখের আড়ালে থাকলেও তিনি আবার নতুন উদ্যম নিয়ে সংগীতে ফিরছেন। বছর শেষে আসছে নতুন গান, আর ভবিষ্যতে নজরুলসংগীত নিয়েও কাজের পরিকল্পনা তাঁর।
Table of Contents
শুরুর গল্প ও প্রতিভার বিকাশ
মাহাদীর সংগীতযাত্রা শুরু ছোটবেলা থেকেই। ১৯৯৫ সালে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতায় ভক্তিমূলক গানে জাতীয় পর্যায়ে তৃতীয় স্থান অর্জন তাঁর প্রথম বড় সফলতা। এরপর ১৯৯৬ সালের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে লোকগীতে প্রথম হন। সংগীতের প্রতি তাঁর অটল সাধনা ও ব্যতিক্রমী গায়কির কারণে ২০০৫ সালে বন্ধুবান্ধব ও শিক্ষকদের উৎসাহে তিনি নাম লেখান জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ওয়ান’-এ। সেখান থেকে উঠে আসেন সেরা এগারোতে, যদিও শেষ পর্যন্ত সেরা দশেই থেমে যায় তাঁর যাত্রা। কিন্তু তার আগেই তিনি দেশব্যাপী আলোচিত হয়ে ওঠেন, শহরে–গ্রামে পোস্টারিং, অটোগ্রাফ–চাওয়া—এসব ছিল তাঁর জীবনের স্মরণীয় অধ্যায়।
উত্থান—‘সুনীল–বরুণা’ থেকে এলিটার সঙ্গে জুটি
রিয়েলিটি শোর পর শুরু হয় তাঁর কনসার্ট ব্যস্ততা। ২০০৭ সালে গানচিল মিউজিক থেকে প্রকাশিত প্রথম একক অ্যালবাম ‘বন্দনা’ তাঁকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। আসিফ ইকবালের লেখা ও প্রিন্স মাহমুদের সুরে “সুনীল–বরুণা” গানটি শুধু তাঁর জনপ্রিয়তাই বাড়ায়নি, জিতিয়েছিল সিটিসেল–চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডও। মাহাদীর ভাষায়, “ক্লোজআপ ওয়ান–এ পরিচিতি এসেছিল কাভার গান দিয়ে, কিন্তু ‘সুনীল–বরুণা’ আমাকে নিজের গানেই পরিচিত করেছে।”
২০০৯ সালে এলিটার সঙ্গে ডুয়েট অ্যালবাম অন্তহীন তাঁর ক্যারিয়ারে আরেকটি সাফল্য যোগ করে। “হৃদয়ের ঝড়ে”, “নিঝুম রাত”, “ভোরের শিশির”—এসব গান তাঁকে কনসার্টমুখী তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর ২০১১ সালে ‘অন্যরকম’ এবং ২০১৫ সালে এলিটার সঙ্গে ‘চল অন্তহীন’ অ্যালবাম প্রকাশ পায়।
অডিও ইন্ডাস্ট্রি বদলে গেলেও গান থামাননি
সিডি–অ্যালবামের যুগ শেষ হয়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যখন উত্থান, তখন অনেক শিল্পী পিছিয়ে পড়লেও মাহাদী থামেননি। একের পর এক একক ট্র্যাক প্রকাশ করেছেন। করোনাকালে প্রায় তিন শ শিল্পীকে নিয়ে মোটিভেশনাল গান “এসো সবাই”-তে কণ্ঠ দেন এবং নির্বাহী প্রযোজকও ছিলেন। গানচিলের ব্যানারে আসে “যখন যুদ্ধে আছি”। পরে বের হয় “কেউ বোঝে তো কেউ বোঝে না”, আর চলতি বছর প্রকাশ পায় “কত কাছে তোমার”—যা গীতিকার আসিফ ইকবাল ও সুরকার ইমন চৌধুরীর যৌথ প্রয়াস।
মাহাদীর দাবি, “অনেকে মনে করেন আমি বিরতিতে ছিলাম; আসলে সব সময়ই কাজ করেছি। সংখ্যার চেয়ে ভালো গানেই মন দিয়েছি।”
বর্তমান জীবন ও সামনে পরিকল্পনা
গানের বাইরে তিনি করপোরেট জীবনেও সফল। ২০১০ সালে আরিফা রহমানকে বিয়ে করেন, তাঁদের কন্যা যুয়েনা ফাতিহা জন্ম নেয় ২০১৫ সালে। এখন তিনি পরিবারসহ ঢাকাতেই থাকেন। চলতি বছরের শেষেই তাঁর নতুন একটি গান প্রকাশের কথা রয়েছে—প্রস্তুতি সম্পন্ন, বাকি শুধু রেকর্ডিং। পাশাপাশি নজরুলসংগীতের নতুন কিছু প্রজেক্টেও ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নতুন পরিকল্পনা আর তাঁর অদম্য সৃজনশীলতা—সবকিছু মিলে আবারও নিজস্ব ছন্দে ফিরছেন গায়ক মাহাদী।
