সৈয়দ আব্দুল হাদী । শিল্পী জীবনী

সৈয়দ আব্দুল হাদী বাংলাদেশের সঙ্গীতাঙ্গনের এক অমর নাম, যাঁর কণ্ঠে দেশাত্মবোধক গান, চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক, রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং লোকগানের মেলবন্ধন শ্রোতাদের হৃদয়ে চিরকালের জন্য স্থান করে নিয়েছে। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় এই শিল্পী পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা পুরুষ প্লেব্যাক কণ্ঠশিল্পী) লাভ করেছেন এবং ২০০০ সালে সঙ্গীতে অসাধারণ অবদানের জন্য বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক প্রাপ্ত হন। তাঁর গানে দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং জীবনের দর্শন এমনভাবে মিশে আছে যে, তিনি শুধু একজন গায়ক নন, বরং একটি সাংস্কৃতিক প্রতীক।

প্রারম্ভিক জীবন ও পারিবারিক প্রভাব

সৈয়দ আব্দুল হাদী জন্মগ্রহণ করেন ১ জুলাই ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার শাহপুর গ্রামে। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন স্থানে—আগরতলা (দাদার বাড়িতে, যিনি আগরতলা কোর্টের উকিল ছিলেন), সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং কলকাতায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তাঁর পরিবার সিলেটে চলে আসে। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় আগরতলার উমাকান্ত একাডেমিতে, এসএসসি পাস করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আনন্দ মডেল হাই স্কুল থেকে এবং এইচএসসি ঢাকা কলেজ থেকে (রংপুরের কারমাইকেল কলেজে ছয় মাস পড়ার পর)।

তাঁর বাবা সৈয়দ আব্দুল হাই ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা—ইপিসিএস (ইস্ট পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস) অফিসার। বাবা নিজে গান গাইতেন এবং গ্রামোফোন রেকর্ডের মাধ্যমে গান শোনার প্রতি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। এই পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা ছোট্ট হাদী কৈশোর থেকেই সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন। বাবার শখের গ্রামোফোন রেকর্ড থেকে তিনি নানা ধরনের গান শোনেন এবং নিজে গেয়ে গেয়ে শিখতে থাকেন। এই প্রাথমিক প্রভাব তাঁর সঙ্গীত জীবনের ভিত্তি স্থাপন করে।

১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তিনি সুবল দাস, পি.সি গোমেজ, আব্দুল আহাদ, আব্দুল লতিফ প্রমুখ প্রখ্যাত শিল্পীদের সান্নিধ্য লাভ করেন, যাঁরা তাঁকে গানের প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ দেন।

কর্মজীবন

সঙ্গীতের পাশাপাশি সৈয়দ আব্দুল হাদী একজন শিক্ষিত ও বহুমুখী ব্যক্তিত্ব। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রযোজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের এক পর্যায়ে তিনি লন্ডনে ওয়েলস ইউনিভার্সিটিতে প্রিন্সিপাল লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কাজ করেন, যা তাঁর পেশাগত বৈচিত্র্যের পরিচয় দেয়। এই সব দায়িত্বের মাঝেও সঙ্গীতকে কখনো ছাড়েননি—বরং এটিকে তাঁর জীবনের মূল কেন্দ্রবিন্দু করে রেখেছেন।

সঙ্গীত জীবন: একটি অসাধারণ যাত্রা

সৈয়দ আব্দুল হাদীর সঙ্গীত যাত্রা শুরু হয় ১৯৬০-এর দশকে, যখন তিনি ছাত্রজীবনেই চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গান গাওয়া শুরু করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি প্রথম একক কণ্ঠে বাংলা চলচ্চিত্রে গান করেন—সিনেমা ‘ডাকবাবু’। গানটির কথা লিখেছিলেন মো. মনিরুজ্জামান এবং সুর দিয়েছিলেন আলী হোসেন। এর আগে তিনি উর্দু ছবিতে গান গেয়েছিলেন, কিন্তু বাংলা প্লেব্যাকে এটাই তাঁর প্রথম স্বতন্ত্র পদক্ষেপ।

বেতারে তাঁর প্রথম জনপ্রিয় গান ছিল ‘কিছু বলো, এই নির্জন প্রহরের কণাগুলো হৃদয়মাধুরী দিয়ে ভরে তোলো’। সালাউদ্দিন জাকির পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘ঘুড্ডি’-তে লাকী আখন্দের সুরে তাঁর গাওয়া ‘সখি চলনা, সখি চলনা জলসা ঘরে এবার যাই’ গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়।

তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান দেশাত্মবোধক গানে। ‘জনম থেকে জ্বলছি’, ‘সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি ও আমার বাংলাদেশ’, ‘জেয়ো না সাথী’, ‘একবার যদি কেউ ভালোবাসতো’, ‘চোখ বুঝিলেই দুনিয়া অন্ধকার’ প্রভৃতি গান তাঁর কণ্ঠে অমর হয়ে উঠেছে। এই গানগুলো মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তিনি প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীতের একক অ্যালবাম ‘যখন ভাঙলো মিলন মেলা’ প্রকাশ করেন, যা তাঁর বহুমুখী প্রতিভার প্রমাণ। তিনি শুধু প্লেব্যাক নন—আধুনিক গান, দেশাত্মবোধক গান এবং রবীন্দ্র-নজরুল সঙ্গীতেও সমান দক্ষ।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সৈয়দ আব্দুল হাদী পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (সেরা পুরুষ প্লেব্যাক কণ্ঠশিল্পী) লাভ করেন:

  • ১৯৭৮: গোলাপী এখন ট্রেনে
  • ১৯৭৯: সুন্দরী
  • ১৯৮০: কসাই
  • ১৯৯০: গরীবের বউ
  • ১৯৯২: ক্ষমা

এছাড়া ঢাকা ৮৬ চলচ্চিত্রের ‘আউল-বাউল লালনের দেশে মাইকেল জ্যাকসন এলোরে’ গানের জন্যও তিনি জাতীয় পুরস্কার পান, যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হাত থেকে গ্রহণ করেন। এই গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। ২০০০ সালে সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ২০১৯ সালে তিনি Standard Chartered-The Daily Star Celebrating Life Lifetime Achievement Award (মিউজিক ক্যাটাগরি) পান।

উল্লেখযোগ্য গান ও অ্যালবাম

তাঁর কিছু কালজয়ী গান:

  • জনম থেকে জ্বলছি
  • সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি
  • জেয়ো না সাথী
  • একবার যদি কেউ ভালোবাসতো
  • চোখ বুঝিলেই দুনিয়া অন্ধকার
  • আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার
  • এই পৃথিবীর পান্থশালায়

তিনি অসংখ্য মিক্সড অ্যালবামে সাবিনা ইয়াসমিন, সামিনা চৌধুরী প্রমুখের সাথে গান করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ৪৫টি পুরনো গান রিমেক করেছেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘জীবনের গান’ (Jiboner Gan) তাঁর জীবন ও সঙ্গীতের অভিজ্ঞতার এক অমূল্য দলিল।

 

সৈয়দ আব্দুল হাদী শুধু একজন গায়ক নন—তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সেতু। তাঁর কণ্ঠে দেশের প্রতি ভালোবাসা, জীবনের বেদনা এবং মানবিকতা এমনভাবে প্রকাশ পায় যে, প্রতিটি গান একটি গল্প বলে। ৮৫ বছর বয়সেও (২০২৫-২৬ সালে) তিনি সঙ্গীতের প্রতি অটুট ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে আছেন। তাঁর অবদান বাংলা সঙ্গীতের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Leave a Comment