বিশ্বজুড়ে দ্রুত সামাজিক পরিবর্তনের এই সময়ে সংগীত শিক্ষার প্রশ্নে সৌদি আরব ও বাংলাদেশের অবস্থান যেন এক তীব্র বৈপরীত্যের ছবি তুলে ধরে। যে দেশ একসময় কনসার্ট, সিনেমা, এমনকি নারীর সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণও নিষিদ্ধ রেখেছিল, সেই সৌদি আরব এখন স্কুলে সংগীত শিক্ষক নিয়োগ দিচ্ছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ বাংলাদেশ, নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বললেও, ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোর চাপে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বন্ধ করে দিয়েছে।
দুটি মুসলিম প্রধান দেশ — একদিকে নবজাগরণের পথে, অন্যদিকে পুরনো রক্ষণশীলতার কাছে পরাজিত।

সৌদি আরবে সংগীত: নিষেধাজ্ঞা থেকে নবজাগরণে
সৌদি সরকার সম্প্রতি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় সংগীত শিক্ষা চালু করার এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে। এটি মূলত শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশের অংশ, যার লক্ষ্য শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সংগীত ও শিল্পকলার সঙ্গে পরিচিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে সৃষ্টিশীল প্রতিভা গড়ে তোলা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে শুরু হয়েছে এই প্রকল্প, যার আওতায় বিশেষত নারী শিক্ষকদের সংগীত বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ২০২২ সালের প্রথম ধাপে ১২ হাজারের বেশি নারী শিক্ষক সরকারি ও বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে সংগীত প্রশিক্ষণ নেন।
বর্তমানে চলছে দ্বিতীয় ধাপ, যেখানে আরও ১৭ হাজার নারী শিক্ষক তাল-লয়, গান, বাদ্যযন্ত্র এবং স্থানীয় লোকসংগীত বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সৌদি সরকারের “সাংস্কৃতিক দক্ষতা উন্নয়ন কৌশল”-এর অংশ, যার উদ্দেশ্য শিশুদের সৃজনশীলতা, আবেগপ্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
শিক্ষকরা এখন স্কুলে শিশুদের গান, ছন্দ, বাদ্যযন্ত্র ও সংগীতের মৌলিক ধারণা শেখাবেন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে সৌদি সরকার শিশুদের মানসিক বিকাশে শিল্প ও সংস্কৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করতে চায়।
২০২৩ সালে রিয়াদের কিং সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো আর্টস কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে সংগীত ও শিল্পকলায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া ২০২০ সালে গঠিত “মিউজিক কমিশন” সংগীত খাতে সমান সুযোগ, তরুণ প্রতিভা বিকাশ এবং সংগীতকে জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কাজ করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি সমাজে লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন এসেছে। এখন দেশে নিয়মিত কনসার্ট, নাট্যোৎসব, সিনেমা প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। যা একসময় ছিল ‘হারাম’, আজ তা-ই হয়ে উঠেছে সৌদি সমাজের নবযাত্রার প্রতীক।

বাংলাদেশ: আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় চাপে পশ্চাদপসরণ
যখন সৌদি আরব সংগীত শিক্ষায় নতুন ইতিহাস রচনায় ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশ যেন সময়ের ঘড়ি উল্টো ঘোরাচ্ছে।
২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ সরকার “সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা ২০২৫” প্রকাশ করে, যেখানে সংগীত ও শারীরিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের প্রস্তাব ছিল। কিন্তু ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশোধিত গেজেট জারি করে সংগীত ও ক্রীড়া শিক্ষক পদ বাদ দিয়ে দেয়।
এর পরপরই শুরু হয় বিতর্ক। বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক সংগঠন ও ইসলামপন্থী দলগুলো এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে, দাবি তোলে সংগীত শিক্ষকের বদলে ধর্ম শিক্ষক নিয়োগের।
প্রতিবাদ, মানববন্ধন ও আলেম সমাজের ফতোয়া — সব মিলিয়ে সরকার শেষ পর্যন্ত চাপের মুখে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়,
“এত অল্পসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে কার্যকর কোনো সুফল আনবে না এবং এতে বৈষম্য সৃষ্টি হবে।”
তবে শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যাখ্যা ছিল রাজনৈতিক চাপ ঢাকবার অজুহাত মাত্র।
অনেকেই মনে করেন, সরকার ধর্মীয় গোষ্ঠীর চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে, যা একটি নেতিবাচক নজির তৈরি করেছে।
ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন নিজেই বিবিসিকে জানিয়েছেন যে, তিনি কওমি মাদ্রাসার যোগ্য শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ করেছেন। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার মন্তব্য করতে রাজি হননি।
শিক্ষাবিদদের মতে, এটি বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় পশ্চাদপসরণ।

দুটি বিপরীত বাস্তবতা: ধর্ম, সংস্কৃতি ও দ্বন্দ্ব
এখানেই দেখা যায় এক গভীর ব্যঙ্গাত্মক বৈপরীত্য। যে সৌদি আরব একসময় ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত ছিল, সেই দেশ এখন স্কুলে সংগীত শেখাচ্ছে।
অন্যদিকে, নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করা বাংলাদেশ, ধর্মীয় উগ্রচাপের মুখে সংগীত শিক্ষা থেকে সরে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন,
“সৌদি আরব যেখানে ধর্মীয় সংস্কারের নামে আধুনিকতা গ্রহণ করছে, বাংলাদেশ সেখানে ধর্মীয় রক্ষণশীলতার কাছে আত্মসমর্পণ করছে।”
সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান বারবার বলেছেন, “আমাদের দেশকে বাঁচাতে হলে ধর্মের নামে চরমপন্থা নয়, সৃষ্টিশীলতার পথে হাঁটতে হবে।”
কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আজ এক দোটানায় — একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান, অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ছায়া।

শিক্ষাবিদদের মত: সংস্কৃতি উন্নতির মাপকাঠি
ঢাকা ও রিয়াদের শিক্ষাবিদরা একমত — সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চা হলো জাতির উন্নতির মাপকাঠি। বাংলাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন,
“সংগীত, চিত্রকলা বা ক্রীড়া—এগুলো বিলাসিতা নয়, এগুলো শিশুদের মানসিক বিকাশের অপরিহার্য উপাদান। ধর্মের দোহাই দিয়ে এগুলো বাদ দেওয়া মানে শিশুদের অসম্পূর্ণ করে তোলা।”
অন্যদিকে সৌদি আরবের মিউজিক কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন,
“আমরা পশ্চিমা হচ্ছি না; আমরা আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছি। সংগীত পাপ নয় — অজ্ঞতাই পাপ।”

দুটি জাতির গল্প: সংস্কৃতি ও সাহসের পার্থক্য
এই দুটি ঘটনার তুলনা মুসলিম বিশ্বের বর্তমান মানসিকতার প্রতিফলন। যেখানে একদল ইসলামি সমাজ আধুনিকতার পথে এগোচ্ছে, অন্যদল ধর্মীয় ভয়ের বেড়াজালে আটকে আছে।
সৌদি আরব আজ সংগীত ও শিল্পকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার হিসেবে গ্রহণ করছে, আর বাংলাদেশ, যেখানে রবীন্দ্রনাথ ও লালনের সুরে জাতির আত্মা গঠিত, সেখানে সংগীতকে আজও “হারাম” তকমা দেওয়া হচ্ছে।
ফলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি হয়েছে —
যা সৌদিতে হালাল, তা বাংলাদেশে হারাম।
সংগীত শিক্ষার এই বিতর্ক আসলে একটি গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করে — একটি জাতি কিসে মাপে তার অগ্রগতি: ভয় দিয়ে, না স্বাধীন চিন্তা দিয়ে?
সৌদি আরবে সংগীত এখন উন্নতির প্রতীক, বাংলাদেশে তা হয়ে উঠেছে বিতর্কের কারণ।
প্রশ্নটি থেকে যায় —
যদি ইসলামের অভিভাবক দেশ সৌদি আরব শিশুদের সংগীত শেখাতে পারে, তবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ মুসলিম গণতন্ত্র তা পারবে না কেন?
