স্মৃতিতে,অমর শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদ

বাংলা সংগীতাঙ্গনের ইতিহাসে যাঁদের নাম উচ্চারিত হলেই এক অনন্য শৈল্পিক ঐতিহ্যের কথা মনে পড়ে, শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদ তাঁদের অন্যতম। তিনি শুধু একজন বিশিষ্ট নজরুলসঙ্গীত শিল্পীই নন, ছিলেন দেশাত্মবোধক ও ইসলামী সঙ্গীতের এক অসাধারণ ব্যাখ্যাকার, যাঁর কণ্ঠে আবেগ, বিশ্বাস ও শিল্পবোধ এক অনন্য সমন্বয়ে প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি—জনপ্রিয়ভাবে পরিচিত ‘বাফা’র সাবেক অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি সংগীতচর্চা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

১৯২৭ সালের ১৫ মার্চ বগুড়া জেলার শেরপুর সদর এলাকায় তাঁর জন্ম। পিতা মহিরউদ্দিন আহমেদ ও মাতা নেকজাহান বেওয়ার সংসারে জন্ম নেওয়া বেদার উদ্দিন শৈশবেই পিতৃহারা হন। জীবনের শুরুতেই সংগ্রাম ও দায়িত্ববোধ তাঁর চরিত্রে গভীর ছাপ ফেলে। মায়ের মুখে শোনা ইসলামী সঙ্গীতই তাঁর সংগীতজীবনের প্রথম অনুপ্রেরণা। এই শোনাই পরবর্তী জীবনে সাধনায় রূপ নেয় এবং তাঁকে বাংলা সংগীতের একজন প্রথিতযশা শিল্পীতে পরিণত করে।

১৯৪২ সালে তিনি সং পাবলিসিটি বিভাগে চাকরিতে যোগ দেন। একই সময়ে তাঁর কণ্ঠের গভীরতা ও সুরবোধ সংগীতবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কলম্বিয়া ও এইচএমভি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে তাঁর গানের রেকর্ড প্রকাশিত হলে তিনি দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে নিয়মিত গান পরিবেশনের মাধ্যমে তিনি তৎকালীন বাংলা সংগীতাঙ্গনের এক সুপরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।

১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং পূর্ব পাকিস্তান বেতারে সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে যুক্ত হন। এখানেই তাঁর শিল্পীসত্তা নতুন মাত্রা পায়। ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাসউদ্দীন আহমেদের ধারাকে তিনি নিজের কণ্ঠে ধারণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে গ্রামীণ সুর ও আধুনিক রুচির এক সেতুবন্ধন তৈরি হয়।

পঞ্চাশের দশকে একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে বেদার উদ্দিন আহমেদ হয়ে ওঠেন এক অনুপ্রেরণার প্রতীক। দেশজুড়ে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সংগীতসভায় তাঁর গাওয়া নজরুলসঙ্গীত ও দেশাত্মবোধক গান মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, ঐক্য ও আত্মমর্যাদার চেতনা জাগিয়ে তোলে।

সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার এবং ১৯৮০ সালে একুশে পদকে ভূষিত হন। এই দুটি সম্মান তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের গৌরবময় স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।

নিচের সারণিতে শিল্পী বেদার উদ্দিন আহমেদের জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

বিষয়তথ্য
জন্ম১৫ মার্চ ১৯২৭
জন্মস্থানশেরপুর সদর, বগুড়া
প্রধান ধারার গাননজরুলসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক, ইসলামী সঙ্গীত
কর্মক্ষেত্রকলকাতা বেতার, পূর্ব পাকিস্তান বেতার
উল্লেখযোগ্য পদবাফার সাবেক অধ্যক্ষ
পুরস্কারবাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৭৪), একুশে পদক (১৯৮০)
ইন্তেকাল১৩ জানুয়ারি ১৯৯৮

১৯৯৮ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও তাঁর গান ও আদর্শ আজও বেঁচে আছে। জাতীয় জাগরণ ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর কণ্ঠ শুধু বিনোদনের উৎস ছিল না, ছিল চেতনা জাগরণের হাতিয়ার। বেদার উদ্দিন আহমেদ তাই কেবল একজন শিল্পী নন—তিনি বাংলা সংগীতের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়।