হৈমন্তী শুক্লা । বাঙালি গায়িকা

হৈমন্তী শুক্লা একজন প্রখ্যাত বাঙালি গায়িকা, যিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্যকে ধারন করে বাংলা এবং হিন্দি সংগীতের জগতে অসামান্য অবদান রেখেছেন। তাঁর পরিবার ছিল হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের অনুসারী, যা তাকে একজন ক্লাসিকালি প্রশিক্ষিত গায়িকা হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

১৯৭২ সালে তিনি প্রথমবার রেকর্ড করেছিলেন গান ‘এতো কান্না নয় আমার’, যা তাঁর সংগীত জীবনের সূচনালগ্নে এক বিশেষ মাইলফলক ছিল। ১৯৭১ সালে তিনি ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতে বৃত্তি লাভ করেন। এরও আগে, তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর একজন নিয়মিত শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে তিনি মিয়া তানসেন পুরস্কারে ভূষিত হন।

হৈমন্তী শুক্লা । বাঙালি গায়িকা

 

প্রাথমিক জীবন

হৈমন্তী শুক্লা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বর, পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা শহরে, সুবিখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী পণ্ডিত হরিহর শুক্লার গৃহে। তিনি তার বাবার কাছ থেকেই প্রাথমিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম.এ. সম্পন্ন করেন। প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী চিন্ময় লাহিড়ীও তাঁর জীবনে শিক্ষক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

 

প্রথম রেকর্ড ও প্রথম পুজোর গান

হৈমন্তীর প্রথম রেকর্ড ছিল ১৯৭০ সালে, যখন তিনি ২১ বছর বয়সে শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের সুরে একটি ছড়াগান রেকর্ড করেন।

তার প্রথম পুজোর গান রেকর্ড করা হয় ১৯৭২ সালে, ২৩ বছর বয়সে। গানটি ছিল শৈলেন মুখোপাধ্যায়ের সুরে এবং লেখা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। গানটির নাম এতো কান্না নয় আমার’

 

সংগীত জীবন

১৯৮৬-৮৭ সালে, হৈমন্তী শুক্লা পণ্ডিত রবিশঙ্কর এর সুরে বাংলা গান করেন। বলিউডে তাঁর প্রথম জনপ্রিয় গান হল কঁহা সে আয়া বদরা’

তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে:

  • ‘আমার বলার কিছু ছিল না’
  • ‘এখনো সারেঙ্গিটা বাজছে’
  • ‘ডাকে পাখি খোলো আঁখি’
  • ‘ঠিকানা না রেখে’
  • ‘আমি অবুঝের মতো’
  • ‘ওগো বৃষ্টি আমার’

সিনেমার গান এবং মৌলিক গান—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি সমান জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।
তিনি যেসব বাংলা সিনেমায় গান গেয়েছেন, সেগুলি হলো:

  • ‘আমি সে ও সখা’ (১৯৭৭)
  • ‘সিস্টার’ (১৯৭৭)
  • ‘অসাধারণ’ (১৯৭৭)
  • ‘দর্পচূর্ণ’ (১৯৮০)
  • ‘ভক্তের ভগবান’ (১৯৯৭)
  • ‘গান্ধর্বী’ (২০০২)
  • ‘অন্তরতম’ (২০০৮)
  • ‘১ নম্বর প্লাম ভিলা’ (২০০৯)
  • ‘আরোহণ’ (২০১০)
  • ‘মুসলমানীর গল্প’ (২০১০)
  • ‘অমৃতা’ (২০১২)

এছাড়া, তিনি কিছু হিন্দি সিনেমায়ও গান গেয়েছেন। হিন্দি সিনেমায় তাঁর প্রথম গান ছিল আমাবস কা চাঁন্দ’ সিনেমা জীবন কি কিতাবো পার’

 

পুরস্কার ও সম্মাননা

হৈমন্তী শুক্লা বিভিন্ন সময়ে বহু সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হন:

  • ১৯৭৩ – প্রতিশ্রুতি পরিষদ পুরস্কার
  • ১৯৭৮ – বাংলা চলচ্চিত্র প্রসার সমিতি শ্রেষ্ঠ গায়িকা
  • ১৯৮২ – সুর শৃঙ্গার আকাডেমি
  • ১৯৮২ – মিঞা তানসেন পুরস্কার
  • ১৯৮২ – বাংলা চলচ্চিত্র প্রচার সংসদ
  • ১৯৮২ – বাংলা চলচ্চিত্র প্রসার সমিতি
  • ১৯৯৯ – বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পরিষদ, সিঙ্গাপুর
  • ১৯৯৯ – এন.এ.বি.সি. বিশ্বজোড়া সহস্রাব্দ উদযাপন
  • ২০০৫ – কলাকার পুরস্কার

 

হৈমন্তী শুক্লা ছিলেন একজন ক্লাসিকালি প্রশিক্ষিত বাঙালি গায়িকা, যিনি হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত এবং বাংলা চলচ্চিত্র সংগীতের জগতে অমর প্রভাব রেখেছেন। তার কণ্ঠের স্বরলহরী, শাস্ত্রীয় প্রশিক্ষণ, এবং অভিজ্ঞ শিল্পীদের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁকে একটি সুনামের সাথে পরিচিত করেছে। চলচ্চিত্র গান হোক বা মৌলিক গান—হৈমন্তীর কণ্ঠ প্রতি সময় শ্রোতাদের হৃদয়ে অমর হয়ে রয়েছে

 

Leave a Comment