সরকার কর্তৃক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সঙ্গীত ও শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক পদ বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আজ সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শিক্ষার্থীরা ব্যতিক্রমী এক সাংস্কৃতিক কর্মসূচির আয়োজন করেন। “কণ্ঠমুক্তির গান” শিরোনামে আয়োজিত এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি ‘গানের মিছিল’ বের করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে নতুন আর্টস বিল্ডিংয়ের সামনে এসে শেষ হয়। সেখানে শিক্ষার্থীরা সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে তাদের বক্তব্য ও দাবি তুলে ধরেন। গান, কবিতা ও স্লোগানের সমন্বয়ে এই প্রতিবাদ ছিল শান্তিপূর্ণ হলেও বার্তায় ছিল তীব্র প্রতিবাদ ও স্পষ্ট রাজনৈতিক–সাংস্কৃতিক অবস্থান।
প্রতিবাদী শিক্ষার্থীরা জানান, প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে সঙ্গীত ও শারীরিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে শিক্ষক পদ বাতিল করা কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক চর্চা, মানবিক বিকাশ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত। তাদের মতে, শৈশব থেকেই সঙ্গীত, শরীরচর্চা ও সৃজনশীল শিক্ষার সুযোগ না থাকলে একটি প্রজন্ম মানসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে দারিদ্র্যের মুখে পড়বে।
এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী দুর্বার আদি বলেন, “এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে সাংস্কৃতিক উৎসব বন্ধ, মন্দিরে হামলা, মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে একটি বাড়তে থাকা অসহিষ্ণুতার চিত্র ফুটে উঠছে। এটি আমাদের সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং নাগরিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।” তিনি আরও বলেন, “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জনগণের আন্দোলন—সব সময় সংস্কৃতি ছিল আমাদের শক্তিশালী অস্ত্র। সংস্কৃতির ওপর আঘাত মানে আমাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত। আজকের গানের মাধ্যমে আমরা সব ধরনের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান জানাচ্ছি, এমনকি সুদান ও ফিলিস্তিনে চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধেও।”
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আদ্রিতা রায় বলেন, “সংবিধানের সাংস্কৃতিক ও মৌলিক অধিকার রক্ষার পরিবর্তে বর্তমান অস্থায়ী সরকার প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোকে আরও শক্তিশালী করছে। এর ফল ভোগ করবে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।”
প্রতিবাদকারীরা শুধু শিক্ষানীতির বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা নারীবিদ্বেষী সহিংসতা, শ্রমিকদের ওপর হামলা, এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধেও তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তাদের মতে, এসব ঘটনা একই ধরনের দমনমূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ।
কর্মসূচির সংক্ষিপ্ত তথ্য টেবিল:
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| কর্মসূচির নাম | কণ্ঠমুক্তির গান |
| আয়োজন | গানের মিছিল ও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ |
| স্থান | জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় |
| শুরু ও শেষ | শহীদ মিনার থেকে নতুন আর্টস বিল্ডিং |
| প্রতিবাদের কারণ | প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সঙ্গীত ও শারীরিক শিক্ষা শিক্ষক পদ বাতিল |
| অতিরিক্ত দাবি | সাংস্কৃতিক অধিকার, নারী ও শ্রমিক নিরাপত্তা, ধর্মীয় ও জাতিগত সহিংসতা বন্ধ |
এই ‘গানের মিছিল’ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ ও মানবিক অধিকারের পক্ষে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করে দিয়েছেন—ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে তারা রাজপথে গান দিয়েই প্রতিবাদ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
