বলিউডের সোনালি যুগের জনপ্রিয় অভিনেত্রী ও প্লেব্যাক গায়িকা সুলক্ষণা পান্ডিত আর নেই। বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, মুম্বাইয়ে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। তাঁর বিদায়ে ভারতীয় সংগীত ও চলচ্চিত্রভুবন হারালো এক বহুমাত্রিক প্রতিভা, যিনি একই সঙ্গে ছিলেন মধুর কণ্ঠের গায়িকা ও পর্দায় সাবলীল অভিনেত্রী।
তার ভাই, খ্যাতনামা সুরকার ললিত পান্ডিত জানিয়েছেন—
“সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান। কিছুক্ষণ শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। আমরা তাঁকে নানাভাটি হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু পৌঁছানোর আগেই তিনি মারা গেছেন।”
Table of Contents
সঙ্গীত–সমৃদ্ধ পরিবারে জন্ম—ছোটবেলা থেকেই সুরের সাধনা
১৯৫৪ সালের ১২ জুলাই, ছত্তিশগড়ের রায়গড়ে জন্ম সুলক্ষণার। পরিবারের প্রতিটি সদস্যই কোনো না কোনোভাবে সুর–সংগীতের সঙ্গে যুক্ত। তিনি কিংবদন্তি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত জসরাজের ভগ্নীপুত্রী, এবং বলিউডের জনপ্রিয় সুরকার জুটি জতিন–ললিতের বোন। ছোট থেকেই গানের পরিবেশে বড় হওয়া সুলক্ষণা অল্প বয়সেই সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট হন।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি প্লেব্যাকে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু তার সংগীত–জীবনের বড় অর্জন আসে সঙ্কল্প (১৯৭৫) ছবির বিখ্যাত গান “তু হি সাগর হ্যায় তু হি কিনারা”–এর মাধ্যমে। গানটি তাকে এনে দেয় ফিল্মফেয়ার সেরা মহিলা প্লেব্যাক সিঙ্গার পুরস্কার।
প্লেব্যাকে সাফল্য—স্মরণীয় সব গান
সুলক্ষণা গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। তার কণ্ঠের কোমলতা, স্বচ্ছতা ও আবেগ শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যেত। উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- “পরদেশিয়া তেরে দেশ মে”
- “বেকরার দিল তুত গায়া”
- “বাঁধি রে কাহে প্রীত”
- “সোমবার কো হুম মিলে”
- লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে ডুয়েট — “সাত সমন্দর পার সে”
তার গাওয়া এসব গান এখনও বলিউডের রেডিও–প্লেলিস্টে নিয়মিত বাজে এবং শ্রোতাদের কাছে সমান প্রিয়।
অভিনয়ে সমান প্রশংসা
গান ছাড়াও তিনি সমান দক্ষতায় জয় করেন পর্দা। ১৯৭৫ সালের উলঝন ছবিতে সঞ্জীব কুমারের বিপরীতে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়ান। এরপর তিনি অভিনয় করেন—
- সঙ্কোচ
- হেরা ফেরি
- অপনাপান
- খানদান
- ধরম কান্তা
- ওয়াক্ত কি দেওয়ার
তার অভিনীত চরিত্রগুলো বৈচিত্র্যময় ছিল—কখনো প্রেমিকা, কখনো মর্মস্পর্শী নায়িকা, কখনো পারিবারিক নাটকের সংবেদনশীল কেন্দ্র।
ব্যক্তিজীবনের ট্র্যাজেডি—সঞ্জীব কুমারকে ভালোবাসা এবং আজীবন অবিবাহিতা থাকা
তার ব্যক্তিজীবনও সিনেমার গল্পের মতো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। তিনি অভিনেতা সঞ্জীব কুমারকে ভালোবাসতেন, কিন্তু সঞ্জীব তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সঞ্জীব কুমারের ১৯৮৫ সালে মৃত্যুর পর সুলক্ষণা গভীরভাবে ভেঙে পড়েন এবং আজীবন বিয়ে করেননি। ধীরে ধীরে তিনি চলচ্চিত্র থেকে দূরে সরে যান।
এক যুগের সমাপ্তি
সুলক্ষণা পান্ডিতের মৃত্যু বলিউডে এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না—ছিলেন এক অনুভূতির নাম, একটি প্রজন্মের স্মৃতির অংশ। তার কণ্ঠ ও অভিনয় চিরকালীন হয়ে থাকবে ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে।
তথ্যসংক্ষেপ (টেবিল)
| তথ্য | বিবরণ |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | সুলক্ষণা পান্ডিত |
| জন্ম | ১২ জুলাই ১৯৫৪, রায়গড়, ছত্তিশগড় |
| মৃত্যু | ৬ নভেম্বর, মুম্বাই |
| বয়স | ৭১ বছর |
| পরিবার | পণ্ডিত জসরাজের ভগ্নীপুত্রী; সুরকার জুটি জতিন–ললিতের বোন |
| প্রধান গান | তু হি সাগর হ্যায়, পরদেশিয়া, বেকরার দিল, সাত সমন্দর পার সে |
| অভিনীত ছবি | উলঝন, সঙ্কোচ, হেরা ফেরি, অপনাপান, খানদান ইত্যাদি |
| পুরস্কার | ফিল্মফেয়ার সেরা মহিলা প্লেব্যাক সিঙ্গার |
| ব্যক্তিজীবন | সঞ্জীব কুমারের প্রতি প্রেম; আজীবন অবিবাহিতা |
সুলক্ষণা পান্ডিতের বিদায়ে ভারতীয় সংগীত–সংস্কৃতি এক অমূল্য রত্ন হারালো। তার কণ্ঠ যেমন অমর, তেমনি অমর হয়ে থাকবে তার শিল্পী–জীবনের অবদান।
