হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে ঠাট হলো রাগ শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি। অসংখ্য রাগকে পরিবারের মতো গুচ্ছবদ্ধ করে বোঝার জন্য যে কাঠামোটি ব্যবহৃত হয়, তার নামই ঠাট। এই প্রণালির মধ্যে সবচেয়ে সরল, স্বচ্ছ ও পশ্চিমা “মেজর স্কেল”-এর সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিলযুক্ত ঠাট হলো বিলাবল ঠাট। এই ঠাটের সুরসমষ্টি আনন্দ, সরলতা ও উজ্জ্বলতার প্রতীক—যা শিক্ষানবীশ থেকে শুরু করে পেশাদার শিল্পীদের কাছেও সমানভাবে প্রিয়।
Table of Contents
বিলাবল ঠাট : হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এক আদর্শ মেজর স্কেল
ঠাট কী?
হিন্দুস্থানি সঙ্গীতে ঠাট হলো সাতটি স্বর (সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি) দিয়ে নির্মিত একটি মৌলিক স্কেল বা সুর-ছক, যার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কিছু রাগ গড়ে ওঠে। সাধারণত একটি ঠাটে থাকে—
- ৭টি স্বর
- কোনো বিশেষ আরোহ-অবরোহ নেই (রাগের মতো বাধ্যতামূলক চলন নেই)
- ভাদী–সম্বাদী নির্ধারিত নয়
- রাগের আবেগ নির্ধারণ করে না, বরং সুরসম্ভারের “কাঁচামাল” দেয়
বিশিষ্ট সংগীততত্ত্ববিদ ভাতখণ্ডে ঠাট–ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন এবং ১০টি প্রধান ঠাট নির্ধারণ করেন—যার মধ্যে বিলাবল অন্যতম।
বিলাবল ঠাটের স্বর বিন্যাস
বিলাবল ঠাটে ব্যবহৃত হয় সব শুদ্ধ স্বর:
সা – রে – গা – মা – পা – ধা – নি – সা
(সবই শুদ্ধ)
এই কারণে একে হিন্দুস্থানি সঙ্গীতের সবচেয়ে “নিরপেক্ষ ও উজ্জ্বল” ঠাট বলা হয়। পশ্চিমা সঙ্গীতে এটি C Major স্কেলের সমতুল্য (যদি সা = C ধরা হয়)।
আবেগ ও রস
বিলাবল ঠাট সাধারণত বহন করে—
- আনন্দ ও উল্লাস
- শান্তি ও প্রশান্তি
- কৌমুদী বা দিবালোকে গাওয়ার উপযোগী ভাব
- শুদ্ধতা ও সরলতা
এই ঠাটের রাগগুলোতে প্রায়ই শিশুতোষ সরলতা থেকে শুরু করে আধ্যাত্মিক উজ্জ্বলতা—সবই প্রকাশ পায়।
বিলাবল ঠাটের অন্তর্ভুক্ত রাগ
নিম্নে বিলাবল ঠাটে নির্মিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাগের নাম দেওয়া হলো:
প্রধান রাগসমূহ
- বিলাবল
- আলহাইয়া বিলাবল
- দেশকর
- শংকর
- দুর্গা
- হেমন্ত
- নত বিলাবল
- শুক্লা বিলাবল
- গৌড় মালহার (আংশিক প্রভাব)
উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য
- রাগ বিলাবল: শুদ্ধ স্বরের সরল সৌন্দর্য
- আলহাইয়া বিলাবল: দ্রুত লয়ের কাজে উপযোগী
- দুর্গা: পেন্টাটোনিক (পাঁচ স্বর) প্রবণতা
- হেমন্ত: গম্ভীর অথচ কোমল ভাব
প্রতিটি রাগ তার নিজস্ব চলন (পকড়), আরোহ–অবরোহ ও আবেগ নিয়ে স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে, যদিও তারা একই ঠাট–পরিবারের সদস্য।
সময় ও পরিবেশ
বিলাবল ঠাটের রাগ সাধারণত—
সকালের শেষ ভাগ
অথবা মধ্যাহ্নের আগে
গাওয়া হয় বলে ধরা হয়।
এই সময়ে মানুষের মন তুলনামূলক উজ্জ্বল ও সজীব থাকে—যা বিলাবল ঠাটের আবেগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শিক্ষায় বিলাবল ঠাটের গুরুত্ব
শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শেখার শুরুতে অধিকাংশ গুরু যে ঠাটটি দিয়ে হাতেখড়ি করান—তা বিলাবল। কেন?
- সব স্বর শুদ্ধ → কান “বেসিক টিউনিং” শেখে
- পশ্চিমা মেজর স্কেলের সঙ্গে মিল → আধুনিক শিক্ষার্থীদের কাছে সহজ
- বহু জনপ্রিয় রাগ এখান থেকে → রাগবোঝা সহজ হয়
এমনও বলা হয়—
“বিলাবল বোঝা মানে অর্ধেক শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বোঝা।”
আধুনিক ব্যবহার ও প্রভাব
আজও বিলাবল ঠাট কেবল রাগসংগীতে নয়—
- চলচ্চিত্র সংগীত
- আধুনিক গজল
- ভজন
- রবীন্দ্রসংগীতের কিছু সুর
- নজরুলসঙ্গীতের কিছু অংশ
—এই সব ধারায় বিলাবলের ছায়া দেখা যায়। কারণ শুদ্ধ স্বরের স্বচ্ছতা শ্রোতাকে সহজেই সংযুক্ত করে।
তুলনামূলক দৃষ্টিতে
| বৈশিষ্ট্য | বিলাবল ঠাট |
|---|---|
| স্বরের ধরন | সব শুদ্ধ |
| আবেগ | উজ্জ্বল, আনন্দময় |
| সময় | সকাল/দুপুর |
| স্কেল টাইপ | Major Scale সমতুল্য |
| শিক্ষায় ভূমিকা | ভিত্তিমূল |

বিলাবল ঠাট হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এক আদর্শ ভিত্তি। এটি শুধু একটি ঠাট নয়—বরং সংগীতের ভিত রচনা করা এক সুরদর্শন। এর স্বচ্ছতা, সরলতা ও উজ্জ্বলতা বহু যুগ ধরে সংগীতজ্ঞদের আকৃষ্ট করে চলেছে।
যে শিক্ষার্থী আজ প্রথম “সা রে গা” শেখে—তার পথ শুরু হয় বিলাবলের আলো দিয়ে। আর সেই আলোই ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে যায় রাগের বিশাল জগতে।
