আসামের সংগীতজগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র জুবিন গার্গ মৃত্যুর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর প্রতি জনগণের ভালোবাসা যেন আরও গভীর হয়েছে। সেই ভালোবাসার একটি তাজা উদাহরণ দেখা গেল ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজে নিযুক্ত এক সাধারণ সরকারি কর্মকর্তার আচরণে। ভোটার তালিকায় জুবিনের নামের পাশে ‘মৃত’ শব্দ লিখতে গিয়ে তিনি আবেগ সামলাতে না পেরে নিজস্ব ভাষায় শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে লিখে দেন— “চিরকাল অমর হয়ে থাকুন, আত্মা চিরশান্তি লাভ করুক।”
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদন বলছে, আসামের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন পুরো রাজ্যজুড়ে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই বুথ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য যাচাই করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই দায়িত্ব পালন করছিলেন তাফিজ উদ্দিন, যিনি কাকতালীয়ভাবে দায়িত্ব পেয়েছিলেন জুবিন গার্গের পারিবারিক পুরোনো এলাকা পরিদর্শনের।
তালিকা হাতে যখন তাফিজ উদ্দিন জুবিনের নাম ও পুরোনো ছবি দেখেন, তখনই আবেগ চেপে রাখতে পারেননি। নিয়ম অনুযায়ী মৃত ভোটারকে ‘ডিএসই–ডিসিজড’ হিসেবে চিহ্নিত করা বাধ্যতামূলক হলেও তিনি সেই নিয়ম ভেঙে শিল্পীর প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তাঁর কাছে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জুবিন গার্গ শুধু একজন গায়ক নন, তিনি আমাদের হৃদয়ের স্পন্দন। তাঁর কণ্ঠস্বর আমাদের শৈশব, তারুণ্য, সংগ্রাম—সবকিছুর স্মৃতি বহন করে। তাঁকে মৃত হিসাবে লিখতে আমার মন সায় দেয়নি।”
এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তোলে। জুবিন গার্গের পরিবারের পক্ষে পালমি বরঠাকুর ঘটনাটি শেয়ার করে লিখেন, “বুথ লেভেল অফিসারের এই ভালোবাসাই আমাদের শক্তি। এ যেন প্রমাণ করে যে জুবিন দাদা শুধু পরিবারের নন, তিনি আসামের প্রতিটি মানুষের আপনজন।” পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং হাজারো মানুষ সেখানে মন্তব্য করেন যে কোনো শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা কতটা গভীর হলে একজন সরকারি কর্মকর্তা এমন ঝুঁকি নিয়ে মানবিকতা প্রকাশ করতে পারেন।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে জুবিন গার্গ কেবল একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না; তিনি আসামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। তাঁর মৃত্যু ১৯ সেপ্টেম্বর সিঙ্গাপুরে হলেও, মানুষের আবেগে তিনি এখনও অটুটভাবে বেঁচে আছেন। নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের মতো যান্ত্রিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াতেও তাঁর স্মৃতি যে এভাবে জায়গা করে নেবে, তা প্রায় কেউই ভাবেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ঘটনা শুধু আবেগপ্রবণতার প্রকাশ নয়, বরং সাংস্কৃতিক আইকনের প্রতি এক সমাজের অনন্য শ্রদ্ধা। একজন শিল্পী যখন মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব রেখে যান, তখন তাঁর মৃত্যু কাগজে-কলমে ঘটলেও মানুষের মনে তিনি অমর হয়ে ওঠেন—তাফিজ উদ্দিনের লেখাটি যেন সেই সত্যকেই আরও একবার দৃঢ় করে তুলে।
