পরকীয়ার টানাপোড়েনে হত্যা: সোনিয়া–ইউসুফের পরিকল্পনার বলি সুমন খলিফা

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আলোচিত সুমন খলিফা হত্যা মামলার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। স্ত্রী সংগীতশিল্পী সোনিয়া আক্তারের পরকীয়ার জেরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে দাবি করেছে জেলা পুলিশ। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হত্যার নেপথ্যের সম্পর্ক, পরিকল্পনা এবং জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে। উদ্ধার করা হয়েছে হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতি ও সুইচ গিয়ার।

হত্যার সূত্রপাত: দাম্পত্য কলহ থেকে রক্তাক্ত পরিণতি

বুধবার (৩ ডিসেম্বর) পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী বলেন, নিহত সুমনের স্ত্রী সোনিয়ার সঙ্গে অভিযুক্ত মেহেদী ওরফে ইউসুফের প্রেম–সম্পর্ক চলছিল দীর্ঘদিন। এই অনৈতিক সম্পর্কের কারণে স্বামী–স্ত্রীর মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া হতো। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, সোনিয়া ও ইউসুফ সিদ্ধান্ত নেন—সুমনকে জীবিত রাখলে তাদের সম্পর্ক টিকবে না।

প্রস্তুতি থেকে হত্যার রাত

পুলিশ জানায়, ৩০ নভেম্বর রাতে সোনিয়া একটি গান পরিবেশনার অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পঞ্চবটি মেথরখোলা এলাকায় যান। সুমন কিছুক্ষণের জন্য অনুষ্ঠানস্থল থেকে বের হলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউসুফ ও তার সহযোগীরা তাকে ফোনে ডেকে নিয়ে আসে। সিএনজি অটোরিকশায় তুলে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় চর কাশীপুরে। নির্জন এলাকায় ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতার বর্ণনায় জানা যায়, সুমনের শরীরের একাধিক জায়গায় গভীর ক্ষত ছিল। উদ্দেশ্য ছিল তাকে এমনভাবে হত্যা করা যাতে পাল্টা প্রতিরোধ বা বেঁচে ফেরার সুযোগ না থাকে।

গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় ও তদন্তের অগ্রগতি

গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জন হলেন—সুমনের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার (২২), মূল পরিকল্পনাকারী মেহেদী ওরফে ইউসুফ (৪২), সহযোগী আব্দুর রহমান (২৮), বিল্লাল হোসেন (৫৮), আলমগীর হাওলাদার (৪৫) এবং নান্নু মিয়া (৫৫)। এদের সবাইকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রযুক্তির সহায়তায় ইউসুফকে গ্রেপ্তারের পর তিনি প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার পরিকল্পনা স্বীকার করেন। তার বয়ান অনুযায়ী বাকি পাঁচজনকে আটক করে পুলিশ। তদন্তকারীরা মনে করছেন, প্রেম–সম্পর্কের জেরই এই হত্যার মূল কারণ। তবে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে কিনা, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মরদেহ উদ্ধার ও মামলা

১ ডিসেম্বর সকালে ফতুল্লার কাশীপুরের নরসিংপুর এলাকায় স্থানীয়রা সুমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ দেখতে পেলে পুলিশকে খবর দেয়। নিহত সুমন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার মন্টু খলিফার ছেলে। পরিবারসহ তিনি সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকায় বাস করতেন। ঘটনার দিনই সুমনের বাবা মন্টু খলিফা ফতুল্লা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

বিশ্লেষণ: সম্পর্কের জটিলতা থেকে সংগঠিত অপরাধ

এই হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র দাম্পত্য সম্পর্কের ভাঙন নয়; এটি পরিকল্পিত, সুসংগঠিত ও বহুজন সম্পৃক্ত একটি অপরাধ। পুলিশ বলছে, সোনিয়া কেবল সম্পর্ক লুকাতে হত্যা করেনি—বরং সক্রিয়ভাবে পরিকল্পনা, যোগাযোগ ও সমন্বয়ে যুক্ত ছিল। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকে চরম অপরাধে জড়ানো নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি উদ্বেগজনক।