ভারতীয় সংগীতে ‘শ্রুতি’ (Shruti/Śruti) হলো সুরের এমন ক্ষুদ্রতম অন্তর বা ধাপ, যা মানুষের কান পৃথকভাবে অনুধাবন করতে পারে এবং কোনও গায়ক বা বাদ্যযন্ত্রী উৎপাদন করতে সক্ষম। অন্য কথায়, এক স্বর থেকে আরেক স্বরে ওঠানামার পথে যে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ধাপের অনুভূতি হয়, সেই সূক্ষ্ম পরিবর্তনকেই বলা হয় শ্রুতি।
প্রাচীন ভারতীয় সংগীতশাস্ত্র—নাট্যশাস্ত্র, দত্তিলম, বৃহদেশী, সঙ্গীত রত্নাকর—এসব গ্রন্থে শ্রুতি ধারণাটি বিস্তৃতভাবে আলোচিত। ছান্দোগ্য উপনিষদে এমনকি স্বরের পরিসরকে ২২ ভাগে বিভক্ত করার উল্লেখ রয়েছে। এ থেকেই ভারতীয় সংগীতে শ্রুতির সংখ্যা ২২ বলে স্বীকৃত হয়।

Table of Contents
শ্রুতি ও স্বর : পার্থক্য কোথায়?
অনেকেই মনে করেন শ্রুতি আর স্বর একই জিনিস—কিন্তু সংগীততত্ত্বে এরা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারণা।
শ্রুতি
- সুরের ক্ষুদ্রতম শ্রবণযোগ্য পার্থক্য
- যে ধাপগুলো রাগকে সূক্ষ্মভাবে রঙিন করে তোলে
- মানুষের কান যে ক্ষুদ্রতম সুরগত পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে
স্বর
- শ্রুতির মধ্য থেকে বাছাই করা নির্দিষ্ট সুরস্থান
- সাতটি প্রধান স্বর: সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি
- রাগ, সুর, স্কেল গঠনের ভিত্তি
নাট্যশাস্ত্র স্পষ্টভাবে জানায়—এক অক্টেভে ২২টি শ্রুতি এবং ৭টি স্বর। অর্থাৎ স্বর হলো প্রাথমিক ধাপ, কিন্তু শ্রুতি সেই ধাপগুলোর সূক্ষ্ম বিভাজন।
শ্রুতির ব্যবহার : রাগসংগীতের সূক্ষ্ম অলঙ্কার
শ্রুতির ধারণা শুধু তত্ত্বে সীমাবদ্ধ নয়। বাস্তব সঙ্গীতে শ্রুতি রাগের চরিত্র নির্মাণেও মুখ্য ভূমিকা রাখে।
বিখ্যাত কিছু উদাহরণ—
- রাগ দরবারিতে অতিরিক্ত কোমল গান্ধার (অতি-কোমল গা)
- রাগ ভৈরব-এ রিষভের বিশেষ সূক্ষ্মতা
- ভিমপলাসি ও মিয়া মালহার-এ নিসাদ
- তোড়ি-তে সূক্ষ্ম গা-র বৈচিত্র্য
এসব ব্যবহারের ফলে রাগের বিশেষ আবহ সৃষ্টি হয়, যা শ্রোতার মনে আলাদা রস সঞ্চার করে।
শ্রুতি ধারণার বহুবিধ অর্থ ও তাত্ত্বিক পার্থক্য
ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে শ্রুতি শব্দটি বিভিন্ন প্রেক্ষিতে ব্যবহৃত হয়েছে। বিশেষ করে গ্রাম পদ্ধতি (Grama System)-এ ভিন্ন অর্থে শ্রুতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
গ্রাম পদ্ধতি অনুযায়ী
ভারত মুনির ব্যাখ্যায়—দুই সুরের মধ্যে এমন ক্ষুদ্র ব্যবধান, যা শ্রুতি দিয়ে আলাদা করে শোনা যায়, তাকেই শ্রুতি বলা হয়েছে।
শ্রুতি নিয়ে বিতর্ক ও আধুনিক মতামত
ভারতীয় সংগীতে আজও শ্রুতি নিয়ে অনুসন্ধান, মতান্তর এবং গবেষণা চলমান। বিশেষত কর্ণাটক সংগীতে, শ্রুতি শব্দটির বহুমাত্রিক অর্থ পাওয়া যায়।
১. বাস্তবে কি ২২টি শ্রুতি ব্যবহৃত হয়?
গবেষণায় দেখা গেছে—
- সব শিল্পী একই রাগে একই মাত্রার শ্রুতি ব্যবহার করেন না
- একই শিল্পী একই রাগে একই স্বর কখনো ভিন্ন সূক্ষ্মতায় ব্যবহার করেন
- অনেক রাগে গামক (oscillation)–এর কারণে মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম সুর শোনা গেলেও তা সবসময় ২২ ভাগকে নির্দেশ করে না
এ কারণে বহু সঙ্গীততাত্ত্বিক মনে করেন—শ্রুতির সংখ্যা স্থির নয়; তা ২২-এর চেয়ে কমও হতে পারে, আবার কিছু ব্যাখ্যায় বেশি হিসেবেও দেখা যায়।
২. শ্রুতির পরিমাণ—পূর্ণ, প্রধান, ন্যূন
একটি প্রভাবশালী গ্রন্থে শ্রুতির তিন ভিন্ন প্রকৃতি উল্লেখ করা হয়েছে—
- পূর্ণ শ্রুতি (Poornā) — বড় ব্যবধান
- ন্যূন শ্রুতি (Nyūnā) — ছোট ব্যবধান
- প্রমাণ শ্রুতি (Pramāṇa) — মানদণ্ড বা মধ্যবর্তী ব্যবধান
শতকরা হিসেবে এদের আনুমানিক মান—২২%, ৭০%, ৯০%। অর্থাৎ সব শ্রুতি সমান নয়; প্রতিটির অনুপাত আলাদা।
শ্রুতি, ধ্বনি, নাদ ও স্বর : পারস্পরিক সম্পর্ক
এই অংশটি সাধারণ পাঠকের জন্য কিছুটা জটিল হতে পারে; তাই সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।
- ধ্বনি (Dhwani) — যেকোনো শব্দ
- নাদ (Nada) — সংগীতযোগ্য শব্দ
- শ্রুতি — নাদের ক্ষুদ্রতম শ্রবণযোগ্য পরিবর্তন
- স্বর — সংগীতের জন্য নির্ধারিত স্থির নাদ
বীণা-শাস্ত্রজ্ঞেরা বলেন—২২টি শ্রুতির মধ্যে কিছু নির্দিষ্ট স্থানে স্বরের ভিত্তি পাওয়া যায়, যেমন:
- ৪র্থ শ্রুতি = সা
- ৭ম = রে
- ৯ম = গা
- ১৩ = মা
- ১৭ = পা
- ২০ = ধা
- ২২ = নি
কীভাবে শ্রুতি চিনে নেওয়া হয়?
একটি স্বর চিনতে মানুষের কর্ণের লাগে ২০–৪৫ মিলিসেকেন্ড।
- যদি কোনও সুর ২০–৪৫ msec-এর বেশি স্থায়ীত্ব পায়, আমরা তাকে শ্রুতি বা স্বর হিসেবে শনাক্ত করতে পারি।
- তার চেয়ে দ্রুত পরিবর্তন ঘটলে আমরা শুধু নাদ শুনতে পাই, কিন্তু পৃথক সুরস্থান নির্ণয় করতে পারি না।
এ কারণেই মীণ্ড, গামক, অতি-দ্রুত অলঙ্কার—এসব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট শ্রুতি নির্ণয় করা কঠিন।
একটি তন্তুবাদ্যে শ্রুতির প্রাকৃতিক অস্তিত্ব
প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়—শ্রুতিকে ‘শ্রব্য’ (যা শোনা যায়) বলা হয়েছে।
একটি তারে নির্দিষ্ট ২২টি বিন্দুতে সুরের অনুভূতি বদলে যায়।
পণ্ডিত মতঙ্গ রচিত বৃহদেশী-তে উল্লেখ আছে—
“যে বিন্দুতে শ্রোতার কানে সুর পরিবর্তনের অনুভূতি জন্মায়, সেই সুরই শ্রুতি।”
শ্রুতির গাণিতিক অনুপাত : পূর্ণ, ন্যূন ও প্রমাণ
শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণে ২২টি শ্রুতির অনুপাত তিন ধরনের—
- 256/243 — পূর্ণ শ্রুতি (বড় ব্যবধান)
- 25/24 — ন্যূন শ্রুতি (ছোট ব্যবধান)
- 81/80 — প্রমাণ শ্রুতি (মানদণ্ডে ব্যবহৃত সূক্ষ্ম পার্থক্য)
এসব অনুপাত রাগের সূক্ষ্মতা নির্ণয়ে অত্যন্ত জরুরি।
গামক ও শ্রুতি
গামক—রাগসংগীতের প্রাণ।
যে কোনও গামকের মধ্যে দুটি ধাপ থাকে—
- শ্রুতি → শনাক্তযোগ্য অংশ
- নাদ → অতিদ্রুত সংযোগ-স্বর
এই সংমিশ্রণই রাগকে তার বৈশিষ্ট্যমূলক অভিব্যক্তি দেয়।
মেলকার্তা পদ্ধতি ও শ্রুতি
৭২ মেলকার্তা রাগ তত্ত্বে ১২টি স্বরের নানা বিন্যাসে স্কেল তৈরি হয়। প্রতিটি রাগে শ্রুতি-প্রয়োগ ভিন্ন হতে পারে, তবে লক্ষ্য হলো রাগের সুরসৌকর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বর ও শ্রুতির সম্পর্ক স্থাপন করা। সাধারণত ব্যবহৃত স্বরগুলোর অনুপাত রাখা হয় 100:125:133.33:150:166.66 ইত্যাদি অনুপাতে।
শ্রুতির সুনির্দিষ্ট মান নির্ণয়—একটি আধুনিক চ্যালেঞ্জ
আধুনিক গবেষণা বলছে—
- শিল্পীভেদে একই রাগে স্বরের সূক্ষ্মতা পরিবর্তিত হয়
- একই শিল্পীও একই রাগ ভিন্ন সময়ে ভিন্ন সূক্ষ্মতায় গাইতে পারেন
- ফলে কোনও নিখুঁত স্থির মান নির্ধারণ করা কঠিন
ফ্লুট, সারণী, সেতার, কণ্ঠ—সব মাধ্যমেই এই বিচিত্রতা পাওয়া গেছে।
এর অর্থ—শ্রুতি হলো সাংগীতিক অভিব্যক্তির একটি জীবন্ত, পরিবর্তনশীল, শিল্পীমনস্ক ধারণা; যান্ত্রিকভাবে নির্ধারিত সংখ্যা নয়।
