উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ ছিলেন দিল্লি ঘরানার এক বিশিষ্ট ও গুণী কণ্ঠশিল্পী, যিনি খেয়াল গায়কিতে শুদ্ধতা, পরিমিতিবোধ ও গভীর শাস্ত্রীয় চর্চার জন্য বিশেষভাবে সম্মানিত। দিল্লি ঘরানার ঐতিহ্যবাহী সংযত অথচ বুদ্ধিবৃত্তিক গায়কির ধারাকে তিনি বিংশ শতাব্দীতে মর্যাদার সঙ্গে বহন করে নিয়ে যান। তিনি ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি প্রচারের বাইরে থেকে নিরলস সাধনার মাধ্যমে শাস্ত্রীয় সংগীতের মূল আদর্শকে অটুট রেখেছিলেন।
Table of Contents
উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ জন্মগ্রহণ করেন উত্তর ভারতের এক সঙ্গীতপ্রবণ মুসলিম পরিবারে। তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং দিল্লি ঘরানার ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। শৈশব থেকেই তিনি সঙ্গীতমুখর পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যেখানে রেওয়াজ, রাগচর্চা ও তালিম ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ।
তাঁর পারিবারিক পরিবেশ তাঁকে খুব অল্প বয়সেই শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। কণ্ঠের স্বাভাবিক স্থিরতা, স্বরশুদ্ধতা ও সুরধারণ ক্ষমতা দেখে পরিবারের প্রবীণ শিল্পীরা তাঁর মধ্যে ভবিষ্যৎ একজন রিয়াজি শিল্পীর লক্ষণ খুঁজে পান।
সঙ্গীত শিক্ষা ও গুরু-পরম্পরা
উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ তাঁর প্রাথমিক ও উচ্চতর সঙ্গীত শিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লি ঘরানার বিশুদ্ধ গুরু-শিষ্য পরম্পরায়। দিল্লি ঘরানার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তাঁর শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়—
- স্বরশুদ্ধতা ও সঠিক শ্রুতি
- সংযত আলাপ ও রাগের শুদ্ধ রূপায়ণ
- লয়ের উপর সংযমী কিন্তু সুদৃঢ় নিয়ন্ত্রণ
- অতিরিক্ত অলঙ্করণ এড়িয়ে রাগের স্বরূপ প্রকাশ
দিল্লি ঘরানার গায়কি আগ্রা বা গ্বালিয়রের মতো অতিশয় বলিষ্ঠ বা তানপ্রধান নয়; বরং এটি পরিচিত পরিমিত, মার্জিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক খেয়াল গায়কি হিসেবে। উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ এই ধারার এক নিখুঁত প্রতিনিধি ছিলেন।
গায়কির বৈশিষ্ট্য
উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁর গায়কি ছিল গভীরভাবে শাস্ত্রনিষ্ঠ ও সংযত। তাঁর কণ্ঠে কখনোই অপ্রয়োজনীয় প্রদর্শন বা দ্রুত জনপ্রিয়তার আকাঙ্ক্ষা দেখা যেত না। তাঁর গায়কির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
- সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর আলাপ
- রাগের চলন স্পষ্ট করে ধীরে ধীরে বিস্তার
- নিখুঁত শ্রুতি ও স্বরশুদ্ধতা
- লয়ের সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত কিন্তু সংযত তান
- রাগের মূল স্বভাব অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবেশন
তিনি মূলত খেয়াল ধারায় পারদর্শী ছিলেন, তবে প্রয়োজনে ঠুমরি ও অন্যান্য হালকা শাস্ত্রীয় ধারাতেও তাঁর দখল ছিল।
মঞ্চজীবন ও পরিবেশনা
উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ খুব বেশি বাণিজ্যিক মঞ্চে নিজেকে উপস্থাপন করেননি। তিনি সীমিত সংখ্যক সংগীত সম্মেলন, দরবার ও বিদ্বৎসমাজে পরিবেশন করতেন। তাঁর পরিবেশনা ছিল মূলত রসিক ও শাস্ত্রীয় সংগীত অনুরাগীদের জন্য—যাঁরা রাগের সূক্ষ্মতা ও শুদ্ধতা অনুধাবন করতে সক্ষম।
তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং রেডিওর মাধ্যমে তাঁর সংগীত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। তাঁর পরিবেশনা ছিল শিক্ষণীয়, বিশেষত সংগীত শিক্ষার্থীদের জন্য।
দিল্লি ঘরানার প্রতিনিধি হিসেবে গুরুত্ব
দিল্লি ঘরানা তুলনামূলকভাবে কম প্রচারিত হলেও ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ ছিলেন সেই অল্পসংখ্যক শিল্পীর একজন, যিনি এই ঘরানার—
- শুদ্ধতা
- সংযম
- বুদ্ধিবৃত্তিক রাগব্যাখ্যা
এই তিনটি মূল স্তম্ভকে নিষ্ঠার সঙ্গে ধারণ করেছিলেন। তাঁর মাধ্যমে দিল্লি ঘরানার গায়কি বিংশ শতাব্দীতেও জীবিত ছিল।
শিষ্যবৃন্দ ও উত্তরাধিকার
উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ খুব বেশি শিষ্য গ্রহণ করেননি। তিনি মনে করতেন, শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রকৃত শিক্ষা দিতে হলে দীর্ঘ সময়, ধৈর্য ও সাধনা প্রয়োজন। তাই তিনি অল্পসংখ্যক যোগ্য শিষ্যকে তালিম দেন, যাদের মাধ্যমে দিল্লি ঘরানার ধারা সীমিত আকারে হলেও পরবর্তী প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে।
মৃত্যু ও মূল্যায়ন
উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁর প্রয়াণ ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের জন্য এক নীরব ক্ষতি ছিল। তিনি এমন এক শিল্পী ছিলেন, যাঁর মূল্যায়ন মূলত রসিক ও বিদ্বৎসমাজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। জনপ্রিয়তার আলোয় না থেকেও তিনি শাস্ত্রীয় সংগীতের মূল আদর্শকে আজীবন রক্ষা করেছেন।

উস্তাদ লতাফত হুসেন খাঁ ছিলেন দিল্লি ঘরানার এক নীরব সাধক—যাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল সঙ্গীতের শুদ্ধতা ও পরম্পরা রক্ষা। তাঁর গায়কি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রকৃত মহত্ত্ব আসে সংযম, সাধনা ও গভীর অনুশীলনের মাধ্যমে।
তিনি ইতিহাসে হয়তো খুব উচ্চকণ্ঠে আলোচিত নন, কিন্তু দিল্লি ঘরানার ধারাবাহিকতায় তিনি এক অপরিহার্য নাম।
