হ্যাপী আখন্দ: পাহাড়ি ঝরনার মতো বয়ে যাওয়া এক সংগীতজীবন

বাংলা সংগীতের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের উপস্থিতি ছিল নীরব অথচ গভীর—ঠিক পাহাড়ি ঝরনার মতো। হ্যাপী আখন্দ তেমনই এক শিল্পী। তিনি ছিলেন একাধারে কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গিটারিস্ট, কিবোর্ড বাদক ও সংগীত পরিচালক—কিন্তু সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনুপ্রেরণার নাম।

‘আমার প্রাণ যে মানে না, কিছুই ভালো লাগে না / কে বাঁশি বাজায় রে’—এই গানটি আজও শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে গিটার হাতে এক তরুণের ছবি। পাশে বসে মুগ্ধ সুবর্ণা মুস্তাফা, আর পর্দায় আসাদ ও নায়লা আজাদ নুপুর। ১৯৮০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ঘুড্ডি-র সেই দৃশ্যটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে আছে। সেই তরুণই হ্যাপী আখন্দ, তখন বয়স মাত্র বিশ।

হ্যাপী আখন্দের জন্ম ১৯৬০ সালের ১২ অক্টোবর ঢাকায়। সংগীতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শুরু হয়েছিল আরও আগে। মাত্র তেরো বছর বয়সে, ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে স্পন্দন ব্যান্ডের সঙ্গে কিবোর্ড বাজিয়ে তিনি দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছিলেন। তখনই অনেকে বুঝে গিয়েছিলেন—এই কিশোর সাধারণ কেউ নয়।

বড় ভাই লাকী আখন্দ ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় প্রেরণা ও অভিভাবক। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে গান করা লাকী আখন্দ ছোট ভাইয়ের প্রতিভা প্রথম আবিষ্কার করেন। ল্যাটিন ব্লুজ, জ্যাজ, রাশিয়ান ও গ্রিক সংগীত—সব মিলিয়ে হ্যাপীর শ্রবণজগৎ ছিল বিস্তৃত, আর সেই বৈচিত্র্যই ধরা পড়েছিল তাঁর গানে।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে রেকর্ড করা ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটি আজও বাংলা গানের মাইলফলক। গানটির জন্মকথা প্রায় কিংবদন্তির মতো—নদীর ধারে দাঁড়িয়ে হঠাৎ সুর, পরে এস এম হেদায়েতের কথায় পূর্ণতা। কিংবদন্তি মান্না দে-ও এই গানের প্রশংসা করেছিলেন।

১৯৭৭ সালে বিটিভির বর্ণালি অনুষ্ঠানে জ্যাজ ঘরানায় গান গেয়ে হ্যাপী আখন্দ আলোড়ন সৃষ্টি করেন। একই সময়ে তিনি স্পন্দনের হয়ে সংগীতায়োজন করেন এবং কিশোর বয়সেই জটিল সংগীত পরিচালনায় দক্ষতার পরিচয় দেন।

১৯৭৯ সালে ফিরোজ রশিদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ব্যান্ড মাইলস। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত Miles অ্যালবামটি ছিল বাংলাদেশের প্রথম সম্পূর্ণ ইংরেজি গানের অ্যালবাম। এরপর আসে A Step Further। যদিও হ্যাপী মূলত গিটারিস্ট ছিলেন, মাইলসে তিনি কিবোর্ডেই বেশি কাজ করেছেন। ১৯৮৬ সালে ব্যান্ড ছাড়েন তিনি।

হ্যাপীর গিটারের সুর—‘নীল নীল শাড়ি পরে’, ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’, কিংবা ‘তুমি আমার প্রথম প্রেমের গান’-এর সেই বিখ্যাত ইন্ট্রো—আজও সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে বাজে। তাঁর রিদম সেন্স, ব্লুজ ও রেগের মেলবন্ধন ছিল সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে।

তিনি শুধু শিল্পী নন, ছিলেন একজন শিক্ষকও। আইয়ুব বাচ্চু, শাফিন আহমেদ, জেমস, কুমার বিশ্বজিৎ থেকে শুরু করে কলকাতার মধু মুখার্জি—অনেকেই তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন। কিন্তু সময়টি ছিল কঠিন। রক ও ব্যান্ড সংগীত তখনও অবমূল্যায়িত। হতাশা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল।

১৯৮৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর, মাত্র ২৭ বছর বয়সে হ্যাপী আখন্দের অকালপ্রয়াণ বাংলা সংগীতকে শূন্য করে দেয়। তাঁর মৃত্যুর পর বড় ভাই লাকী আখন্দও দীর্ঘদিন সংগীত থেকে দূরে সরে যান।

আজও যখন কাঁধে গিটার ঝোলানো কোনো তরুণকে দেখা যায়, তখন অনেকের মনেই ভেসে ওঠে একটি নাম—হ্যাপী আখন্দ। পাহাড়ি ঝরনার মতো বয়ে যাওয়া যে সংগীতজীবন, তা থেমে গেলেও তার শব্দ আজও থামেনি।

হ্যাপী আখন্দ: সংক্ষিপ্ত তথ্যছক :

বিষয়তথ্য
জন্ম১২ অক্টোবর ১৯৬০, ঢাকা
মৃত্যু২৮ ডিসেম্বর ১৯৮৭
প্রধান পরিচয়কণ্ঠশিল্পী, সুরকার, গিটারিস্ট, কিবোর্ড বাদক
উল্লেখযোগ্য গানআবার এলো যে সন্ধ্যা, কে বাঁশি বাজায় রে
ব্যান্ডমাইলস
উল্লেখযোগ্য অ্যালবামMiles (১৯৮২), A Step Further (১৯৮৬)
অবদানবাংলা ব্যান্ড ও আধুনিক সংগীতে পথিকৃৎ