বিশ্ব সংগীতের ইতিহাসে বিয়ন্সে নোলস-কার্টার কেবল একটি নাম নয়, বরং একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ড। ফোর্বস ম্যাগাজিনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পপ সম্রাজ্ঞী এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের বা বিলিয়নিয়ার। সংগীত জগতের এই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানো তিনি পঞ্চম ব্যক্তি। তাঁর আগে এই তালিকার সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন তাঁর স্বামী জে-জেড, পপ তারকা টেইলর সুইফট, ব্রুস স্প্রিংস্টিন এবং রিয়ানা। বিয়ন্সের এই অর্জন কেবল তাঁর কণ্ঠের জাদুতে নয়, বরং তাঁর অসাধারণ ব্যবসায়িক প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শী বিনিয়োগের ফসল।
পার্কউড এন্টারটেইনমেন্ট: এক স্বয়ংসম্পূর্ণ সাম্রাজ্য
বিয়ন্সের এই আর্থিক সাফল্যের মূলে রয়েছে ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত তাঁর নিজস্ব বিনোদন সংস্থা ‘পার্কউড এন্টারটেইনমেন্ট’। সাধারণ শিল্পীরা যেখানে বড় বড় প্রোডাকশন হাউসের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, সেখানে বিয়ন্সে তাঁর সব মিউজিক অ্যালবাম, তথ্যচিত্র এবং কনসার্ট এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেই প্রযোজনা করেন। এতে করে শিল্পী হিসেবে তিনি যেমন সৃজনশীল স্বাধীনতা পান, তেমনি লভ্যাংশের সিংহভাগ অন্য কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে না গিয়ে সরাসরি তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা হয়। এই স্বাধীন ব্যবসায়িক মডেলে ঝুঁকি বেশি থাকলেও সঠিক পরিচালনার মাধ্যমে তিনি মুনাফাকে সর্বোচ্চ স্তরে নিয়ে গেছেন।
বিয়ন্সের আয়ের প্রধান উৎস ও ব্যবসায়িক পরিসংখ্যান (২০২৫)
বিয়ন্সেকে এক বিলিয়ন ডলারের ক্লাবে পৌঁছে দিতে যে খাতগুলো সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে, তা নিচে ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
| আয়ের উৎস ও মাধ্যম | বিস্তারিত তথ্যাবল | আয়ের পরিমাণ (আনুমানিক) |
| রেনেসাঁ ওয়ার্ল্ড ট্যুর (২০২৩) | বিশ্বব্যাপী আয়োজিত সফল কনসার্ট সিরিজ | ৬০০ মিলিয়ন ডলার |
| কাউবয় কার্টার ট্যুর (২০২৫) | টিকিট ও মার্চেন্ডাইজ বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ | ৪৫০ মিলিয়ন ডলার |
| নেটফ্লিক্স ডিল (হোমকামিং) | ২০১৯ সালের বিশেষ তথ্যচিত্রের জন্য চুক্তি | ৬০ মিলিয়ন ডলার |
| এনএফএল হাফটাইম শো | ২০২৪ সালের ক্রিসমাস ডে পারফরম্যান্স ফি | ৫০ মিলিয়ন ডলার |
| রেনেসাঁ কনসার্ট ফিল্ম | প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র পরিবেশনা থেকে আয় | ৪৪ মিলিয়ন ডলার |
| বার্ষিক আয় (২০২৫) | সংগীত ক্যাটালগ ও এনডোর্সমেন্ট থেকে প্রাপ্ত | ১৪৮ মিলিয়ন ডলার |
কনসার্ট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আকাশচুম্বী আয়
বিগত কয়েক বছরে বিয়ন্সের ক্যারিয়ারে অভূতপূর্ব জোয়ার দেখা গেছে। বিশেষ করে তাঁর ‘রেনেসাঁ ওয়ার্ল্ড ট্যুর’ বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে ৬০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি আয় করেছে। এরপর ২০২৪ সালে কান্ট্রি ঘরানার অ্যালবাম ‘কাউবয় কার্টার’ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি প্রথা ভেঙে নতুনত্বের সূচনা করেন, যা ২০২৫ সালের বৈশ্বিক ট্যুর আয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই ট্যুরে শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই সংগৃহীত হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি। এ ছাড়া কনসার্টে বিক্রি হওয়া টি-শার্ট ও অন্যান্য সামগ্রী থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত আয় হয়েছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের সাথে তাঁর দীর্ঘমেয়াদী চুক্তিও তাঁর সম্পদ বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। ২০১৯ সালের তথ্যচিত্র ‘হোমকামিং’-এর জন্য তিনি ৬০ মিলিয়ন ডলারের বড় অংকের পারিশ্রমিক পান। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের শেষের দিকে নেটফ্লিক্সের বিশেষ ক্রীড়া আয়োজনে পারফর্ম করার জন্য ৫০ মিলিয়ন ডলার পান তিনি। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালে বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী সংগীতশিল্পী হিসেবে তাঁর কর-পূর্ববর্তী আয় ছিল ১৪৮ মিলিয়ন ডলার।
বিয়ন্সের এই বিলিয়নিয়ার হয়ে ওঠা আধুনিক শিল্পীদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিভা যখন ব্যবসায়িক দূরদর্শিতার সাথে মিলে যায়, তখন একজন শিল্পী কেবল বিনোদনদাতা থাকেন না, তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বজুড়ে এক প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সংগীতের এই সম্রাজ্ঞী এখন তাঁর মালিকানাধীন সংগীত ক্যাটালগ, স্থাবর সম্পত্তি এবং বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাথে চুক্তির মাধ্যমে তাঁর সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করছেন।
