বাদ্যযন্ত্র পরিচয় : বাঁশি

বাঁশি—এই নামটি শুনলেই মনে পড়ে যায় কৃষ্ণের মোহন বাঁশির সেই মধুর সুর, যা গোপীদের মন হরণ করেছিল। প্রাচীনকাল থেকেই বাঁশি মানব সভ্যতার সঙ্গী। বেদ, পুরাণ, মহাভারত ও রামায়ণে বাঁশির উল্লেখ পাওয়া যায়। এটি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়—এটি আধ্যাত্মিকতা, ভক্তি, প্রকৃতির সঙ্গে মিলন এবং মানব হৃদয়ের গভীর অনুভূতির প্রতীক। ভারতীয় উপমহাদেশে বাঁশিকে বলা হয় মুরলি, বংশী, মোহন বাঁশি বা বাঁশরি। পাশ্চাত্যে এর নাম ফ্লুট (Flute)। বাংলাদেশ ও ভারতে বাঁশি সঙ্গীতের অবিচ্ছেদ্য অংশ—ক্লাসিকাল, লোকসঙ্গীত, ভক্তিসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত থেকে শুরু করে আধুনিক ফিউশন মিউজিক—সর্বত্রই এর ব্যবহার অপরিহার্য।

নানা রঙের বাঁশি, কলকাতা, ভারত

বাঁশির গঠন ও কাঠামো

বাঁশি একটি সুষির বাদ্যযন্ত্র, অর্থাৎ ফুঁ দিয়ে বাজানো যায়। এটি মূলত একটি নলাকার পাইপ বা বাঁশের টুকরো, যার একপ্রান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ (বায়ুরোধী) করে দেওয়া হয়। বন্ধ প্রান্তের কাছাকাছি একটি ছোট ছিদ্র থাকে—যার মাধ্যমে কৌশলে ফুঁ দিতে হয়। এরপর পাইপের গায়ে সাতটি (কখনো আটটি) ছিদ্র থাকে, যা আঙুল দিয়ে খোলা-বন্ধ করে বিভিন্ন সুর তৈরি করা হয়। বাংলাদেশ ও ভারতে বেশিরভাগ হারমোনিয়াম তৈরিতে তরলা বাঁশ (মুলি বাঁশ) ব্যবহার করা হয়। এই বাঁশের গুণ হলো পুরুত্ব সমান, গিট বা গিরা কম এবং সহজে ছিদ্র করা যায়। কিছু শখের বাঁশিবাদক শিল্পী ষ্টিল, তামা, পিতল, রূপা বা এমনকি সোনার পাইপ দিয়েও বাঁশি তৈরি করান—যা খুবই দামি এবং বিশেষ সুরের জন্য ব্যবহৃত হয়।

বাঁশির প্রকারভেদ:

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে বিভিন্ন ধরনের বাঁশি প্রচলিত। প্রধান প্রকারভেদগুলো হলো:

  1. সরল বাঁশি — সবচেয়ে সাধারণ এবং সহজে বাজানো যায়। সাতটি ছিদ্র থাকে, শিক্ষানবিশদের জন্য আদর্শ।
  2. আড় বাঁশি — কিছুটা লম্বা এবং নিচু সুরের। ক্লাসিকাল সঙ্গীতে বেশি ব্যবহৃত।
  3. টিপরাই বাঁশি — ছোট আকারের, উচ্চ সুরের। লোকসঙ্গীতে বেশি শোনা যায়।
  4. সানাই বাঁশি — সানাইয়ের সুরের সাথে মিল রেখে তৈরি, খুব মিষ্টি সুর।
  5. ভিন বাঁশি — ছয়টি ছিদ্রের সরল বাঁশি, লোকসঙ্গীতে বেশি ব্যবহৃত।
  6. মোহন বাঁশি — পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া ও পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের স্টাইলে ব্যবহৃত বিশেষ ধরনের বাঁশি, যাতে সাতটি ছিদ্রের পাশাপাশি অতিরিক্ত ছিদ্র থাকে শুদ্ধ মধ্যম ও পঞ্চমের জন্য।

 

ঢাকা চারুকলা ভবনের সামনে বাঁশি বাজাচ্ছেন একজন ছাত্র

 

বাঁশির গঠন

বাঁশি হলো বিশ্বের প্রাচীনতম এবং সবচেয়ে সরল বাদ্যযন্ত্রগুলোর একটি। এর গঠন এতটাই সহজ যে দেখে মনে হয় প্রকৃতি নিজেই এটি মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে। তবু এই সরল নলাকার যন্ত্র থেকে যে মধুর সুর বের হয়, তা হৃদয়কে ছুঁয়ে যায় এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষকে মুগ্ধ করে আসছে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গীতে বাঁশির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষ্ণের মোহন বাঁশি থেকে শুরু করে পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষের ক্লাসিকাল বাঁশি—সবই এই যন্ত্রের গঠনের উপরই নির্ভর করে। আজ আমরা বিস্তারিতভাবে জানব বাঁশির গঠন কীভাবে হয়, কোন উপাদান ব্যবহার করা হয় এবং কীভাবে এর প্রতিটি অংশ সুরের মান নির্ধারণ করে।

বাঁশির প্রধান উপাদান: বিশেষ ধরনের বাঁশ

বাঁশির মূল উপাদান হলো বাঁশ—বিশেষ করে “তরলা বাঁশ” বা “মুলি বাঁশ” (Bambusa tulda বা Dendrocalamus strictus)। এই বাঁশের বিশেষত্ব হলো এর দুটি গাঁটের (নোড) মাঝের অংশ অনেকটা লম্বা (৪০-৭৫ সেমি) এবং পুরুত্ব সমান। এই লম্বা অংশই বাঁশির দেহ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ধরনের বাঁশ প্রধানত হিমালয়ের পাদদেশে (১১,০০০ ফিট পর্যন্ত উচ্চতায়) এবং পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় প্রচুর জন্মায়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল (অসম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম, ত্রিপুরা) এবং কেরালার পাহাড়ি অঞ্চলে এই বাঁশ সহজলভ্য। বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলেও এই ধরনের বাঁশ পাওয়া যায়।

বাঁশ নির্বাচন ও প্রস্তুতি

বাঁশি তৈরির জন্য বেছে নেওয়া হয় ২-৩ বছর বয়সের পরিপক্ক বাঁশ। বাঁশের ব্যাস হওয়া উচিত আঙুলের মতো পাতলা থেকে মাঝারি (২-৩ সেমি)। খুব পুরু বাঁশে সুর ভারী হয়, আর খুব পাতলায় সুর দুর্বল হয়ে যায়। বাঁশ সংগ্রহের পর রোদে শুকানো হয় যাতে আর্দ্রতা চলে যায় এবং বাঁশ সোজা হয়। কিছু নির্মাতা তেল বা রেজিন মাখিয়ে বাঁশকে আরও শক্ত ও মসৃণ করেন। এরপর বাঁশের গুণমান যাচাই করা হয়—গিট (নোড) কম হওয়া চাই, দেয়ালের পুরুত্ব সমান হওয়া চাই।

ছিদ্র তৈরির প্রক্রিয়া

বাঁশের একপ্রান্ত সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়—সাধারণত প্রাকৃতিক গিট দিয়ে বা কাঠের প্লাগ দিয়ে। বন্ধ প্রান্তের কাছাকাছি একটি ছোট ছিদ্র করা হয়—যেখানে ফুঁ দেওয়া হবে। এই ছিদ্র থেকে শুরু করে ৬-৮টি ছিদ্র করা হয়। ছিদ্রগুলো সমানভাবে সারিবদ্ধ না থাকায় ডান-হাতি ও বাম-হাতি বাঁশি আলাদা আলাদা তৈরি করতে হয়। ছিদ্র করার জন্য আগুনে পোড়ানো লোহার শলাকা ব্যবহার করা হয়—ড্রিল মেশিন নয়। কারণ ড্রিল করলে বাঁশের ফাইবার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সুরের মান খারাপ হয়। ছিদ্রের ব্যাস ও দূরত্ব খুব সূক্ষ্মভাবে নির্ধারণ করা হয়—এটিই বাঁশির স্বর ও স্কেল নির্ধারণ করে।

আধুনিক বাঁশির উপাদান

ঐতিহ্যগতভাবে বাঁশের বাঁশি সবচেয়ে জনপ্রিয়, কিন্তু আধুনিক যুগে হাতির দাঁত, ফাইবার গ্লাস, ইবোনি, তামা, পিতল, রূপা বা এমনকি সোনার বাঁশিও তৈরি হয়। এগুলো দামি এবং বিশেষ সুরের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে সবচেয়ে মধুর সুর এখনো মুলি বাঁশের বাঁশিতেই পাওয়া যায়।

বাঁশির দৈর্ঘ্য ও সুরের সম্পর্ক

বাঁশির দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩০ সেমি থেকে ৭৫ সেমি হয়। লম্বা বাঁশিতে সুর গভীর ও নিম্ন (বেস) হয়, ছোট বাঁশিতে সুর উচ্চ ও তীক্ষ্ণ হয়। পরিধি সাধারণত বুড়ো আঙুলের মতো। বড় বাঁশিতে কড়ি মধ্যমের ছিদ্র পায়ের আঙুল দিয়ে বন্ধ করা হয়, ছোট বাঁশিতে কনিষ্ঠা আঙুল দিয়ে।

আধুনিক উন্নয়ন

পণ্ডিত ভেঙ্কটেশ গোদখিন্ডির আবিষ্কার “পঞ্চম ছিদ্র” (পঞ্চম হোল) বাঁশির গঠনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। এতে পা ও মা স্বরের মধ্যে মীড় (গ্লাইড) করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া শুদ্ধ মা ও কোমল গা বাজানোর জন্য অতিরিক্ত ছিদ্র যুক্ত করা হয়।

বাঁশির গঠন প্রকৃতির সরলতা ও মানুষের শিল্পের অপূর্ব সমন্বয়। একটি সাধারণ বাঁশের টুকরো থেকে যে মধুর সুর বের হয়, তা হাজার বছর ধরে মানুষকে মুগ্ধ করে আসছে। বাঁশির প্রতিটি ছিদ্র, প্রতিটি মাপ এবং প্রতিটি উপাদান সঙ্গীতের জন্য নিবেদিত। সঠিক বাঁশি বেছে নিলে এবং সঠিকভাবে যত্ন নিলে এটি কেবল যন্ত্র নয়—আপনার হৃদয়ের সঙ্গী হয়ে উঠবে। বাঁশির সেই মোহন সুর আজও বেজে চলেছে—যেন কৃষ্ণের বাঁশি এখনো বাজছে, শুধু শুনতে হবে মন দিয়ে।

 

বাঁশি তৈরির পদ্ধতি:

বাঁশি তৈরি একটি শিল্প ও বিজ্ঞানের সমন্বয়। প্রথমে বিশেষ ধরনের মুলি বাঁশ নির্বাচন করা হয়—যার ব্যাস ও পুরুত্ব সমান এবং গিট কম। বাঁশটি রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়, তারপর বাঁশির দৈর্ঘ্য অনুযায়ী কেটে নেওয়া হয়। এরপর বাঁশের অংশগুলো মসৃণ করা হয়। পেন্সিল ও রুলার দিয়ে ছিদ্রের সঠিক স্থান চিহ্নিত করা হয়। তারপর কয়লার আগুনে পোড়ানো লোহার শলাকা দিয়ে ছিদ্র করা হয়। ছিদ্রের পর নকশা আঁকা হয় এবং মাটির প্রলেপ দিয়ে আবার আগুনে সেঁকা হয়। শুকানোর পর বার্নিশ করা হয়। শেষে ফুঁ দিয়ে সুর পরীক্ষা করা হয়। একটি ভালো বাঁশি তৈরিতে কয়েক সপ্তাহ লাগে এবং এটি সম্পূর্ণ হাতের কাজ।

বাঁশির নম্বর ও স্কেল:

বাঁশির স্কেল নম্বর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। এটি বাঁশির দৈর্ঘ্য ও সুরের উচ্চতা নির্দেশ করে। উদাহরণস্বরূপ:

  • ৮ ১/২ (সাড়ে আট) → C# (সি শার্প)
  • ৮ → C (সি)
  • ৭ → B (বি)
  • ৬ ১/২ (সাড়ে ছয়) → A# (এ শার্প)
  • ৬ → A (এ)
  • ৫ ১/২ (সাড়ে পাঁচ) → G# (জি শার্প)
  • ৫ → G (জি)

ছোট নম্বরের বাঁশি উচ্চ সুরের, বড় নম্বরের বাঁশি নিম্ন সুরের।

বাঁশির স্বরগ্রাম ও সুরের পরিসর:

বাঁশিতে সঙ্গীতের সাতটি স্বর (সা রে গা মা পা ধা নি) এবং পাঁচটি বিকৃত স্বর (কোমল ও তীব্র) সহ মোট ১২টি স্বর পাওয়া যায়। তবে বাঁশির সুর পরিবর্তন করা যায় না, তাই প্রতিটি স্কেলের জন্য আলাদা বাঁশি লাগে। একজন পেশাদার বাঁশিবাদকের কাছে সাধারণত ১২টি বাঁশি থাকে।

সাধারণ বাঁশিতে স্বরের পরিসর:

  • উদারা সপ্তক: পা ধা নি
  • মধ্য সপ্তক: সা রে গা মা পা ধা নি
  • তারা সপ্তক: সা রে গা মা পা

আধুনিক বাঁশিতে পঞ্চম ছিদ্র (পঞ্চম হোল) আবিষ্কার করেছেন পণ্ডিত ভেঙ্কটেশ গোদখিন্ডি, যার ফলে পা ও মা স্বরের মধ্যে মীড় (গ্লাইড) করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া শুদ্ধ মা ও কোমল গা বাজানোর জন্য অতিরিক্ত ছিদ্রও থাকে।

বাঁশি

বাঁশির ইতিহাস ও গুরুত্ব:

বাঁশি হলো বিশ্বের প্রাচীনতম বাদ্যযন্ত্রগুলোর একটি। প্রাচীন মিশর, চীন, গ্রিসে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতীয় সঙ্গীতে বাঁশির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় সামবেদে। কৃষ্ণের মোহন বাঁশি, পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, পণ্ডিত পান্নালাল ঘোষ, উস্তাদ বড়ে গুলাম আলী খানের বাঁশি—সবই বাংলা ও ভারতীয় সঙ্গীতের অমর অংশ।

বাঁশি কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র নয়—এটি হৃদয়ের ভাষা, প্রকৃতির সুর এবং আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। এর সরলতা ও গভীরতা একসঙ্গে মিলিত হয়ে শ্রোতার মনে অপার শান্তি ও আনন্দের সঞ্চার করে। যারা বাঁশি বাজান বা শোনেন, তারা জানেন—একটি ভালো বাঁশি কেবল সুর দেয় না, মনকে ছুঁয়ে যায়। বাঁশির সেই মধুর সুর আজও আমাদের সঙ্গে আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে—যতদিন মানুষের হৃদয়ে সঙ্গীতের আকাঙ্ক্ষা থাকবে।