১৯৭৬ সালে রেকর্ড হয় ‘আয় খুকু আয়’, গানটি যার সঙ্গে আজও দুই বাংলার শ্রোতার মনে অম্লান। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গানটি প্রথমে প্রজন্মকে নাড়া দেয়নি, কিন্তু ধীরে ধীরে প্রতিটি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। বাংলাদেশেও পরে ‘দ্য ফাদার’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়। এই বছরই গানটির ৫০তম বার্ষিকী।
গানটির অন্যতম কণ্ঠশিল্পী শ্রাবন্তী মজুমদারের জন্মদিন ৩ জানুয়ারি। ৫০ বছর পূর্তির উপলক্ষে হোয়াটসঅ্যাপে গায়িকার সঙ্গে আলাপচারিতায় মিলিত হন সাংবাদিক মাসুম অপু।
আইল অব ম্যান থেকে ফোনে ভেসে আসে সেই চেনা মিষ্টি কণ্ঠ, “হ্যালো, শ্রাবন্তী বলছি…বাংলাদেশ থেকে ফোন করেছেন? দারুণ লাগছে!”
শ্রাবন্তীর কণ্ঠ শুধুমাত্র একটি নাম নয়; এটি এক নস্টালজিয়া। পুরোনো জিঙ্গেল—বোরোলিন ক্রিম, হেয়ার অয়েল—সবই তাঁর গলায় শ্রুতিমধুর হয়ে উঠত। তিনি জানান, “জিঙ্গেল গাইতে অডিশন দিতে গিয়েছিলাম লুকিয়ে। খালি গলায় দুটো গান গেয়েছি। স্টুডিওর মালিক আমার উচ্চারণ ও টেক্সচার শুনে মুগ্ধ হয়ে চারটি গানও রেকর্ড করালেন।”
‘আয় খুকু আয়’-এর কথার রচয়িতা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুরকার ভি বালসারা। শ্রাবন্তী বলেন, “অনেকে মনে করেন এটা হেমন্তদার গান। কিন্তু এটা মূলত আমার অ্যালবামের জন্য। একবার পড়তেই চোখে জল চলে এল। বললাম, শুধু করবই না, হেমন্তদার সঙ্গে গাইব।” পরে তিনজন—শ্রাবন্তী, পুলকদা, বালসারা—হেমন্তদার বাসায় গিয়ে গানটি গাওয়ার অনুমতি নেন।
শুরুতে গানটি খুব জনপ্রিয় হয়নি। শ্রাবন্তী স্মৃতিচারণ করেন, “গান বেরোনোর দুই বছর পরও মানুষ শুনতে চাচ্ছিল না। মঞ্চে একাই গাইতে শুরু করি। ধীরে ধীরে সবাই শুধু ‘আয় খুকু আয়’-ই শুনতে চাইছিল।”
বাংলাদেশেও ‘দ্য ফাদার’-এ ব্যবহারের পর গানটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়। শ্রাবন্তী বলেন, “অনেকে শুনে কেঁদে ফেলেন। বাবাকে হারানোর পর নিজেও বহুবার কেঁদেছি। কবে যে গানটির ৫০ বছর হয়ে গেল, টের পাইনি।”
শ্রাবন্তী মজুমদারের সঙ্গীত জীবন সমৃদ্ধ—শাস্ত্রীয় প্রশিক্ষণ, আধুনিক গান ও ইংরেজি পপের মিশ্রণ। তিনি শুধু জিঙ্গেল বা সিনেমার গান নয়, লোকগান ও ফিউশন ধারার গানে নিজস্ব ছাপ রেখেছেন।
শ্রাবন্তীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলি
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| জন্মদিন | ৩ জানুয়ারি |
| প্রাথমিক প্রশিক্ষণ | গুরু সুধীর বন্দ্যোপাধ্যায় |
| প্রধান সাফল্য | ‘আয় খুকু আয়’ (১৯৭৬) |
| অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গান | ‘তুমি আমার মা…আমি তোমার মেয়ে’, ‘নাম বোলো না’ |
| স্থায়ী ঠিকানা | ডগলাস, আইল অব ম্যান |
| আন্তর্জাতিক সংযোগ | রুনা লায়লা, আলী যাকের, ফকির আলমগীরের সঙ্গে কাজ |
| জনপ্রিয়তা | বাংলাদেশ ও ভারতের পাশাপাশি ইউটিউব, ফেসবুক, সিনেমায় বহুল পরিচিত |
২৫ বছর আগে কলকাতা ছেড়ে তিনি আইল অব ম্যানের ডগলাসে স্থায়ী হন। সেখানেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠ। ফেসবুকে নিজের পরিচয় জানিয়ে বললেন, “আমি প্রথমে বাঙালি, দ্বিতীয়তও বাঙালি, শেষ পর্যন্তও বাঙালি।”
বাংলাদেশের শিল্পী ও শ্রোতাদের সঙ্গে স্মৃতি এখনও উজ্জ্বল। চট্টগ্রামে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা, ঢাকায় অনুষ্ঠান, সোলসের ‘মন শুধু মন ছুঁয়েছে’—সবই তাঁর জীবনের অমূল্য অংশ। দূরদূরান্ত থেকে তিনি বাংলার সঙ্গীতপ্রেমীদের সঙ্গে সংযোগ রাখছেন এবং বারবার ফিরে যেতে চাইছেন।
‘আয় খুকু আয়’ শুধুই গান নয়—এটি দুই বাংলার বাবাদাওয়াত, নস্টালজিয়া এবং প্রেমের আবেগের এক চিরন্তন প্রতীক।
