কনস্টেবল থেকে তারকা, অসমাপ্ত যাত্রা

২০০৭ সাল দার্জিলিং পাহাড়ের ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায়। কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা নয়, সেদিন পাহাড় কাঁপিয়েছিল আবেগ, গর্ব আর স্বপ্নের উল্লাসে। পাহাড়ের সন্তান, কলকাতা পুলিশের কনস্টেবল প্রশান্ত তামাং তখন ইন্ডিয়ান আইডল–এর তৃতীয় আসরের ফাইনালে। মাত্র ২৫ বছর বয়সে তিনি প্রথমবারের মতো গোর্খা সমাজকে ভারতের জাতীয় বিনোদনমঞ্চে দৃশ্যমান করেন। পাহাড়জুড়ে শুরু হয় নজিরবিহীন উদযাপন—সমাবেশ, প্রার্থনা, তহবিল সংগ্রহ আর ভোট দেওয়ার আহ্বান।

বিচারকদের নানা সমালোচনা সত্ত্বেও দর্শকের বিপুল সমর্থনে প্রশান্ত তামাং শিরোপা জয় করেন। সেই জয় শুধু একজন শিল্পীর সাফল্য ছিল না; তা গোটা গোর্খা সমাজের আত্মসম্মান ও পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিজয়ের পর তাঁর অ্যালবাম ‘ধন্যবাদ’ প্রকাশিত হয় এবং ‘বীর গোর্খালি’ গানটি পাহাড়ের মানুষের আবেগের ভাষায় রূপ নেয়।

কিন্তু এই গৌরবের যাত্রা হঠাৎই থেমে গেল। গত রোববার নয়াদিল্লির বাসভবনে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৪৩ বছর। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। স্ত্রী গীতা থাপা তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। তিনি রেখে গেছেন মা, দুই বোন—অর্চনা ও অনুপমা—এবং স্ত্রীকে।

ইন্ডিয়ান আইডল জয়ের পর প্রশান্ত তামাং এক কোটি টাকার পুরস্কার পান। এরপর শুরু হয় তাঁর নেপালি চলচ্চিত্রযাত্রা। ২০১০ সালে ‘গোর্খা পল্টন’ দিয়ে বড় পর্দায় অভিষেকের পর ‘আংগালো মায়া কো’, ‘কিনা মায়া মা’, ‘নিশানি’, ‘পরদেশি’সহ একাধিক ছবিতে অভিনয় করেন। টেলিভিশনেও তাঁর উপস্থিতি ছিল; অতিথিশিল্পী হিসেবে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে জনপ্রিয় ওয়েব সিরিজের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও পরিচিত হন।

তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি শোকবার্তায় বলেন, জাতীয় খ্যাতিসম্পন্ন এই শিল্পীর আকস্মিক প্রয়াণ অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

প্রশান্ত তামাংয়ের নাম গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের ইতিহাসেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০০৭ সালে পাহাড়ে যে ক্ষোভ ও আত্মপরিচয়ের জাগরণ দেখা দেয়, সেখানে তিনি হয়ে ওঠেন নীরব অনুপ্রেরণার প্রতীক। ২০১৭ সালের আন্দোলনের সময়ও তিনি মানুষের পাশে থাকার কথা বলেছিলেন এবং সংগ্রামের জন্য গান লেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।

তুংসুংয়ে বেড়ে ওঠা এক সাধারণ ছেলের গল্প—বাবাকে হারিয়ে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়া, কলকাতা পুলিশের ব্যান্ডে গান গাওয়া, সেখান থেকে জাতীয় তারকায় পরিণত হওয়া। প্রশান্ত তামাং তাই কেবল একজন গায়ক বা অভিনেতা নন; তিনি একটি প্রজন্মের আশা, পরিচয় ও সংগ্রামের প্রতীক।

প্রশান্ত তামাং: সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি

বিষয়তথ্য
জন্মস্থানদার্জিলিংয়ের তুংসুং
পেশাগায়ক, অভিনেতা
উল্লেখযোগ্য অর্জনইন্ডিয়ান আইডল (তৃতীয় আসর) বিজয়
চলচ্চিত্র অভিষেকগোর্খা পল্টন (২০১০)
মৃত্যু৪৩ বছর বয়সে, নয়াদিল্লি