চান্দের বাত্তির স্রষ্টা আরমান খানের জীবনের পথ

আজ ৩ ফেব্রুয়ারি। দেশের সংগীতাঙ্গনের অদম্য সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক আরমান খানের জন্মদিন। তবে আজকের দিনে শহরের মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি নেই, কেক কাটা অনুষ্ঠান নেই, নতুন গানের ঘোষণা নেই—তবু ‘নান্টু ঘটক’ উচ্চারণ করলেই স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সেই সুপরিচিত লাইন: “পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা!”। একসময়ের সুপারহিট গানগুলোর স্রষ্টা হলেও আজকাল তিনি শিল্পাঙ্গনের আলো থেকে খানিকটা দূরে। তবু তাঁর সৃষ্টি আজও মানুষের জীবনে সমান প্রাসঙ্গিক।

১৯৯০-এর শেষ এবং ২০০০-এর শুরুর দিকে বাংলা গানের বাজার মূলত অডিও অ্যালবামের উপর নির্ভরশীল ছিল। সেই সময় আরমান খান দেশের অন্যতম ব্যস্ত সংগীত পরিচালক হিসেবে পরিচিত হন। বিভিন্ন শিল্পীর সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা এবং নাটকের আবহসংগীত পরিচালনা—সব মিলিয়ে তিনি শিল্পাঙ্গনের চাহিদার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।

বছরঅডিও অ্যালবাম সংখ্যাউল্লেখযোগ্য কাজ
২০০২‘দোকান’, ‘তিন সত্যি’
২০০৩‘লাল বন্ধু নীল বন্ধু’, ‘ঘটক’
২০০৪‘দোস্ত দুশমন’, বিভিন্ন নাটকের আবহসংগীত
২০০৫নতুন একক গান ও স্টুডিও প্রজেক্ট

উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০০২–২০০৫ এর মধ্যে মাত্র তিন বছরে তিনি প্রায় ২৩টি অডিও অ্যালবাম সম্পন্ন করেছেন। নাট্যকার আবদুল্লাহ আল-মামুনের লেখা ‘জোয়ার ভাটা’ ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে তাঁর নাটকের আবহসংগীত যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ১২০০টির বেশি নাটকের সঙ্গীতায়োজন তাঁর সৃজনশীলতার সাক্ষ্য বহন করে।

তবে সাফল্যের সঙ্গে মিলেছিল ক্লান্তি ও হতাশা। শিল্পী ও যন্ত্রশিল্পীদের কম পারিশ্রমিক, অডিও ক্যাসেট ও সিডির বাজারে পাইরেসির উত্থান—সব মিলিয়ে আরমানকে সংগীত থেকে দূরে সরে আসতে বাধ্য করে।

২০১৩ সালে তিনি শ্রীমঙ্গল গ্র্যান্ড সুলতান হোটেলে যোগ দেন এবং বিক্রয় ও বিপণন বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন। ধীরে ধীরে হোটেল পরিচালনার দায়িত্ব বেড়ে গিয়ে বর্তমানে তিনি মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৯ সালে আতিথেয়তা খাতে সেরা মহাব্যবস্থাপক হিসেবে স্বীকৃতি পান।

সংগীতের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হননি তিনি। ২০২১ সালে প্রকাশ করেন ‘বন্ধু’ এবং প্রয়াত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর স্মরণে ‘আসা–যাওয়া’। এছাড়া চাচা আজম খানের স্মৃতিতে তৈরি করেন ‘গুরু রে’। ইউটিউব চ্যানেল ‘বেস্ট অ্যান্ড গ্রেট’-এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের প্রবীণদের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে গান ও সৃজনশীলতার গল্প তুলে ধরছেন।

ব্যক্তিজীবনে স্ত্রী এমি খান, ছেলে আরহাম খান এবং মেয়ে আনতারা রাইসা খান। তিনি সময় পেলেই পিয়ানোর সামনে বসে সুরের অনুশীলন করেন। পাহাড় ঘেরা শ্রীমঙ্গলে নিভৃত জীবনই এখন তাঁর দৈনন্দিন, যেখানে সংগীতের স্মৃতি ও সৃষ্টিশীলতার অনুরণন এখনও বেজে ওঠে।

আজ আরমান খান আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও, তাঁর গান এখনো মানুষের উৎসবের অংশ। বিয়ে, গায়েহলুদ বা গ্রামাঞ্চলের আনন্দঘন মুহূর্তে বাজে সেই চিরচেনা সুর: “পোলা তো নয় যেন আগুনের গোলা!”। সময় বদলেছে, কিন্তু সুরের আবেদন অটুট।