বিশ্ব সংগীতের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডস’-এর এবারের আয়োজন কেবল সুরের মূর্ছনায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা রূপ নিয়েছে এক শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিবাদে। পুয়ের্তো রিকোর প্রখ্যাত র্যাপার ব্যাড বানি থেকে শুরু করে বিলি আইলিশের মতো তারকারা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অভিবাসনবিরোধী কঠোর নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। অন্যদিকে, অনুষ্ঠান শেষ হতে না হতেই নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমালোচনা ও অনুষ্ঠানের মান নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি প্রদান করেছেন।
ব্যাড বানির ঐতিহাসিক জয় ও কড়া বার্তা
এবারের গ্র্যামিতে ইতিহাস গড়েছেন পুয়ের্তো রিকোর র্যাপার ব্যাড বানি। তাঁর আলোচিত অ্যালবাম ‘ডেবি তিয়ার মাস ফোতোস’-এর জন্য তিনি প্রথম স্প্যানিশ শিল্পী হিসেবে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেন। তবে পুরস্কার গ্রহণের মাহেন্দ্রক্ষণে তিনি শুধু জয় উদ্যাপন করেননি, বরং গর্জে উঠেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের ইমিগ্রেশন নীতির বিরুদ্ধে। তিনি আবেগের সাথে বলেন, “আমরা পশু বা এলিয়েন নই; আমরা মানুষ এবং আমেরিকান।” যারা নিজের জন্মভূমি ছেড়ে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছেন, তাঁদের প্রতি এই পুরস্কার উৎসর্গ করে তিনি ‘আইস আউট’ (অভিবাসনবিরোধী সংস্থা ICE-এর কর্মকাণ্ড বন্ধের ডাক) স্লোগানকে সমর্থন জানান। উল্লেখ্য, এই বিভাগে ছাড়াও তিনি আরও দুটি গ্রামোফোন নিজের ঝুলিতে ভরেছেন।
শিল্পীদের সম্মিলিত প্রতিবাদ ও ‘আইস আউট’ পিন
পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে অভিবাসন ইস্যুতে শিল্পীদের অবস্থান ছিল সুসংগঠিত। লাল গালিচা থেকে শুরু করে মূল মঞ্চ—সবখানেই দেখা গেছে প্রতিবাদের প্রতীক। জাস্টিন ও হেইলি বিবার দম্পতি, প্রখ্যাত শিল্পী জনি মিচেল এবং হেলেন জে শেনের মতো তারকারা তাঁদের পোশাকে ‘আইস আউট’ পিন পরে সংহতি প্রকাশ করেন। কিউবান-আমেরিকান সংগীতশিল্পী গ্লোরিয়া এস্তেফান ডিটেনশন সেন্টারে আটকে থাকা শত শত শিশুর কথা স্মরণ করে এই নীতিকে ‘অমানবিক’ বলে আখ্যা দেন।
নিচে গ্র্যামির মঞ্চে অভিবাসন ইস্যুতে সংহতি জানানো প্রধান শিল্পীদের তালিকা দেওয়া হলো:
| শিল্পীর নাম | বিশেষ বক্তব্য বা অবস্থান |
| ব্যাড বানি | ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ জয়ী; অভিবাসীদের মানুষ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি। |
| গ্লোরিয়া এস্তেফান | ডিটেনশন সেন্টারে শিশুদের দুরবস্থা ও পরিবারের বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ। |
| শাবুজি | অভিবাসীদের হাত ধরেই যুক্তরাষ্ট্র গঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য। |
| অলিভিয়া ডিন | সেরা নবাগত শিল্পী; নিজেকে অভিবাসীর নাতনি হিসেবে পরিচয় প্রদান। |
| সিজা ও বিলি আইলিশ | লড়াই চালিয়ে যাওয়া এবং রাজপথে চলা সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার। |
ট্রেভর নোয়ার সঞ্চালনা ও ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া
দক্ষিণ আফ্রিকান কমেডিয়ান ট্রেভর নোয়া এবার শেষবারের মতো গ্র্যামি সঞ্চালনা করেন। উদ্বোধনী বক্তৃতায় তিনি নিকি মিনাজের রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা করে বলেন যে, নিকি হয়তো হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সাথে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আলোচনায় ব্যস্ত। তবে এই বিদ্রূপ ও সামগ্রিক অনুষ্ঠানটি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পছন্দ হয়নি। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখেন যে, অনুষ্ঠানটি ছিল ‘দেখার অযোগ্য’ এবং ট্রেভর নোয়া একজন ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’ সঞ্চালক। এমনকি তিনি ট্রেভর নোয়ার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও হুমকি দিয়েছেন।
সংগীতের এই বিশাল আসরটি শেষ পর্যন্ত কেবল পুরস্কার বিতরণের মঞ্চ হয়ে থাকেনি, বরং এটি হয়ে দাঁড়িয়েছে মানবিকতা এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যকার এক সংঘাতের ক্ষেত্র। শিল্পীদের এই সাহসী অবস্থান বিশ্বজুড়ে অভিবাসীদের অধিকার রক্ষায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
