রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের আকাশ তখন মেঘমুক্ত, কিন্তু বাতাসে বইছে উন্মাদনার তপ্ত ঢেউ। ঘড়ির কাঁটায় রাত ১১টা ৪৫ মিনিট। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন বাংলা রক সংগীতের মুকুটহীন সম্রাট মাহফুজ আনাম জেমস। নিজের ষষ্ঠ গানের রেশ কাটিয়ে সপ্তম গানের জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ পেছনে ফিরে দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা ড্রামার আহসান এলাহি ফান্টিকে ছোট একটি ইশারা করলেন—মুখে উচ্চারণ করলেন মাত্র একটি শব্দ, ‘বাংলাদেশ’। মুহূর্তেই গিটারের সেই চিরচেনা জাদুকরী ইন্ট্রো বেজে উঠল, যা উপস্থিত হাজারো দর্শকের গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার জন্য ছিল যথেষ্ট।
প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে কালজয়ী সেই গানটি শুরু হতেই এক অনন্য আবহের সৃষ্টি হয়। জেমসের দরাজ কণ্ঠে বেজে ওঠে— ‘তুমি মিশ্রিত লগ্ন মাধুরীর জলে ভেজায় কবিতায়/ আছ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা, ভাসানীর শেষ ইচ্ছায়/ তুমি বঙ্গবন্ধুর রক্তে আগুনে জ্বলা জ্বালাময়ী সে ভাষণ/ তুমি ধানের শিষে মিশে থাকা শহীদ জিয়ার স্বপন’। গানটির প্রতিটি চরণে ধ্বনিত হচ্ছিল দেশপ্রেমের এক গভীর আকুতি। দীর্ঘ বিরতির পর জেমসকে মঞ্চে এই গানটি গাইতে দেখে দর্শকদের মধ্যে যেন প্রশান্তির ফল্গুধারা বয়ে যায়। জনশ্রুতি ছিল, রাজনৈতিক নানা কারণে গানটি গাওয়ার ক্ষেত্রে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ছিল, যদিও নগরবাউল জেমস বরাবরই বলে এসেছেন—সবই নির্ভর করে মঞ্চে তাঁর তাৎক্ষণিক ইচ্ছার ওপর।
‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টের প্রেক্ষাপট
দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তার সংকটে গত কয়েক মাস ধরে কোনো বড় কনসার্ট বা সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজিত হয়নি। সংগীতপ্রেমীদের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ উপলক্ষে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে আয়োজন করা হয় বিশেষ কনসার্ট ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন রাত ১২টা পর্যন্ত মানিক মিয়া অ্যাভিনিউকে রূপ দিয়েছিল এক সুরের সাগরে।
কনসার্টের মূল আকর্ষণ ও পারফরম্যান্স তালিকা:
| শিল্পী/ব্যান্ড | উল্লেখযোগ্য পরিবেশনা | বিশেষত্ব |
| শিরোনামহীন | হাসিমুখ, বন্ধ জানালা, এই অবেলায় | ভক্তদের সমবেত কোরাস ও মোবাইল লাইট ডিসপ্লে। |
| জেফার রহমান | ঝুমকা | নববিবাহিত জেফার ও রাফসান সাবাবের অনবদ্য রসায়ন। |
| ওয়ারফেজ | পূর্ণতা, অসামাজিক, অবাক ভালোবাসা | রক মিউজিকের উত্তাল উন্মাদনা ও হেভি মেটাল রিফ। |
| দিলশাদ নাহার কনা | জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের গান ও মৌলিক ট্র্যাক | প্রাণবন্ত নাচে দর্শকদের মাতিয়ে রাখা। |
| নগরবাউল জেমস | বাংলাদেশ, মা, পাগলা হাওয়া, কবিতা | কনসার্টের প্রধান আকর্ষণ ও সমাপনী পরিবেশনা। |
শিরোনামহীন ও ওয়ারফেজের রক উন্মাদনা
রাত সাড়ে আটটার দিকে মঞ্চে ওঠে জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘শিরোনামহীন’। ‘হাসিমুখ’ গানের প্রথম সুর বাজার সাথে সাথেই হাজারো দর্শক কণ্ঠ মেলায় শেখ ইশতিয়াকের সাথে। ব্যান্ডের প্রতিটি গানে যেন শ্রোতাদের দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কেটে যেতে থাকে। এরপর মঞ্চ কাঁপাতে আসে কিংবদন্তি ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’। তাদের ‘অসামাজিক’ এবং ‘অবাক ভালোবাসা’ গানের সময় পুরো মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ যেন এক বিশাল হেডব্যাং জোন-এ পরিণত হয়। ড্রামের বিট আর গিটারের গর্জনে রক সংগীতের আদিম রূপটি নতুন করে ফিরে পায় তরুণ প্রজন্ম।
জেমসের অসুস্থতা ও ভক্তদের ভালোবাসা
রাত ১১টায় যখন জেমস মঞ্চে ওঠেন, তখন দর্শকদের চিৎকার যেন সংসদ ভবনের এলাকা ছাড়িয়ে বহুদূর চলে যায়। ‘কবিতা’ দিয়ে শুরু করে একে একে শোনান ‘দিওয়ানা মাস্তানা’, ‘দুষ্ট ছেলের দল’ এবং ‘মা’। তবে জেমসকে কিছুটা অসুস্থ ও ক্লান্ত মনে হচ্ছিল। কাশির তীব্রতার কারণে কয়েকবার মঞ্চের পেছনে গিয়ে আদা দেওয়া গরম পানি খেতে দেখা যায় তাঁকে। কিন্তু অসুস্থতা তাঁর পেশাদারিত্বে বিন্দুমাত্র আঁচড় কাটতে পারেনি। বারবার তিনি ভক্তদের উদ্দেশে বলছিলেন, “তোমরা আমার জান, তোমরাই আমার প্রাণ।”
ভক্তদের উন্মাদনা এতটাই ছিল যে, কয়েকবার নিরাপত্তা বলয় ভেঙে জেমসকে ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়। তবে নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। রাত ঠিক বারোটায় ‘আসবার কালে আসলাম একা’ গানটি গাওয়ার মাধ্যমে শেষ হয় জেমসের পারফরম্যান্স। একই সাথে সমাপ্তি ঘটে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ কনসার্টের। এই রাতটি কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান ছিল না, বরং ছিল দেশের সংস্কৃতি ও সুরের ঐতিহ্যে ফিরে আসার এক সম্মিলিত বিজয়গাঁথা।
