গীতিকার আসিফ ইকবালের জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

কিছু মানুষ আছেন, যাদের কাজ সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। তাঁরা শুধু নিজের নয়, তাঁদের প্রজন্মের জীবনেরও বাঁধন জোড়া ধরেন। কবিতা লেখেন না, তবু তাঁদের গানের কলি হয়ে ওঠে অজস্র মানুষের ভালোবাসার ভাষা। সেইসব নামের এক শীর্ষে আছেন আসিফ ইকবাল—বাংলাদেশের সঙ্গীতজগৎ ও কর্পোরেট অঙ্গনের এমন এক মুখ, যার পরিচয় আজ বহুমাত্রিক এবং অনুপ্রেরণার মতো দীপ্ত।

ছোটবেলার শুরু: চট্টগ্রামের মাটিতে বেড়ে ওঠা

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কাঞ্চনা ইউনিয়নে জন্ম নেন আসিফ ইকবাল। সময়টা তাঁর শৈশবে সমাজে আর্থিক সংকটের, কিন্তু সাংস্কৃতিক উষ্ণতায় ভরা। বাবা-মায়ের যত্ন আর সঙ্গীত-বোধ তাঁকে ছোটবেলা থেকেই সৃজনশীল করে তোলে। গান, গল্প, কবিতা—যে কোনও ভালো প্রকাশ ছিল তাঁর কাছে নিজেকে বোঝার এক উপায়।

শিক্ষাজীবনের পথটাও তেমনি পরিশ্রম ও মনোযোগের দৃষ্টান্ত। তিনি চট্টগ্রামের সেন্ট প্লাসিড্‌স হাই স্কুল, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল, এবং পরে চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনা করেন। সেখানে গঠন হতে থাকে তাঁর প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্বগুণ। তারপর উচ্চশিক্ষার গন্তব্য—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ), যেখানে তিনি মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

আইবিএ থেকেই শুরু হয় তাঁর জীবনের দুই ভিন্ন অথচ সমান্তরাল স্রোত—একদিকে পেশাদারিত্বের কঠিন কর্পোরেট দুনিয়া, আরেকদিকে গান ও লেখা–বোনা সংবেদনশীল কাব্যজগত।

সঙ্গীতের পথচলা: শব্দের অতলে অর্থের সৃষ্টি

আসিফ ইকবাল গত—প্রায় তিন দশক ধরে—বাংলা গানের জন্য লিখে চলেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন চলচ্চিত্র, আধুনিক গান, একক অ্যালবাম এবং বিশেষ সংগীত উদ্যোগে অসাধারণ অবদানের জন্য।
বাংলাদেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে নানা প্রজন্মে যেমন নচিকেতা বা বাপ্পা মজুমদারের মতো শিল্পীরা গেয়েছেন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হয়ে, তেমনি সেই সুরের আড়ালে যে কবির কলম কথা বলেছে, তাঁদের মধ্যে আসিফ ইকবালের স্থান অনন্য।

তাঁর লেখা অসংখ্য গানের মধ্যে এমন কিছু আছে যেগুলো জনপ্রিয়তার দিক থেকে সময়ের আইকনে পরিণত হয়েছে।
যেমন—“সাদা আর লাল”, যা একসময় শ্রোতাদের মুখে মুখে ফিরত, কিংবা অনিমেষ আইচের চলচ্চিত্র “ভয়ঙ্কর সুন্দর”-এর জন্য তাঁর লেখা গভীর আবেগপূর্ণ সাউন্ডট্র্যাক।

তারপর আসে অনলাইন যুগ। সেখানে তাঁর লেখা “জীবনের আয়না” গানটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের অংশ—বাংলাদেশে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ভাইরাল হওয়া প্রথম মৌলিক গান। রাকিব মুসাব্বিরের সুরে, পারভেজ সাজ্জাদের কণ্ঠে গানটি অজস্র তরুণের জীবন-সঙ্গীতে স্থান পায়।

তাঁর লেখা “অভিমানী আকাশ” অ্যালবামটি (২০১২) ছিল তাঁর নিজের অডিও লেবেল “গানচিল” থেকে প্রকাশিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রজেক্ট, যেখানে সব গানই তাঁর লেখা। সেই সময় বাংলা গানের বাজার যখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন এই দায়িত্ব নেওয়া ছিল এক সাহসিক সিদ্ধান্ত—যা তাঁকে গীতিকার থেকে উদ্যোগপতি ও সঙ্গীত-উদ্ভাবকের স্থানে পৌঁছে দেয়।

এক সেতুবন্ধন: কর্পোরেট মেধা ও সাংস্কৃতিক হৃদয়

আসিফ ইকবাল বাংলাদেশের একজন সফল কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব হিসেবেও সমান সম্মানিত। তাঁর কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবনী শক্তি এবং নেতৃত্বগুণ তাঁকে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম মুখে পরিণত করেছে। তিনি একসময় মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর এফএমসিজি বিভাগের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি হামিদ গ্রুপের গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO) হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

একদিকে যিনি মিটিং রুমে কর্পোরেট পরিকল্পনা তৈরি করেন, অন্যদিকে একই মানুষ রাত শেষে শব্দে শব্দে বাঁধেন প্রজন্মের প্রিয় প্রেমগীতি—এই দ্বৈত সত্তার মধ্যে আসিফ ইকবালকে সত্যি বিশেষ করে তোলে।

তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্য কখনও শিল্পচর্চার মূল্যকে ম্লান করেনি; বরং সর্বত্র তিনি তুলে ধরেছেন একটাই বার্তা—“সংস্কৃতি হলো দেশের ব্র্যান্ড, আর শিল্পই জাতির আত্মা।”

শেখানোর মানুষ: শিক্ষকতার প্রতি ভালোবাসা

শুধু শিল্পী বা কর্পোরেট নেতা নয়, আসিফ ইকবাল বহু বছর ধরে শিক্ষকতাও করেছেন। তিনি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিসাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি-র মার্কেটিং বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন, যেখানে শত শত শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে শিখেছেন সৃজনশীল চিন্তা, বিজ্ঞাপন-নির্মাণ ও ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনের বাস্তব প্রয়োগ। তাঁর ক্লাস নিত শুধু প্রবন্ধ বা স্লাইডে নয়, বরং জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় ভরা কথায়। তাঁর শিক্ষার্থীরাই বলেন—“স্যার পড়ান না, অনুপ্রেরণা দেন।”

পুরস্কার ও সম্মাননা: কৃতিত্বের পথচিত্র

তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আসিফ ইকবাল পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা:

  • চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০১৭ – আধুনিক গানে সেরা গীতিকার
  • বিএমজেএ মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০১৯সেরা গীতিকার
  • চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০২২ – আধুনিক গানে সেরা গীতিকবি
  • চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড ২০২৪শ্রেষ্ঠ গীতিকার

তবে পুরস্কারের থেকেও বড় অর্জন হলো শ্রোতাদের ভালোবাসা—যা তিনি পেয়েছেন নিরন্তর, সীমাহীনভাবে।

ব্যক্তিজীবন ও মানবিক সত্তা

ব্যক্তিজীবনে আসিফ ইকবাল বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন আফসানা আসিফ-এর সঙ্গে। তিনি পরিবারকেও কর্মের সমান ভালোবাসায় ধারণ করেন, এবং নিজের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকা স্বীকার করে আসছেন অকপটে।

মানবিক মানুষ হিসেবে তিনি সবসময় নতুন প্রজন্মের সৃজনশীল তরুণদের পাশে দাঁড়িয়েছেন— হোক তা কোনো তরুণ সুরকারের প্রথম গান রিলিজ করা, বা কোনো প্রাধান্যহীন সংগীতপ্রকাশনা প্রযোজনায় হাত বাড়ানো।

শব্দের ভেতর এক জীবন

আসিফ ইকবালের গানের বৈশিষ্ট্য হলো এর সততা ও মানবিকতা। তাঁর শব্দগুলো বাজারকেন্দ্রিক নয়— তাতে আছে ভেতরের আবেগ, সত্য আর সম্পর্কের অভিধান। কখনও ভালোবাসার কথা বলেছেন নিভৃত মাধুর্যে, কখনও জীবনের কথাই বলেছেন সমাজচেতনায় ভেজানো হৃদয়ের সুরে।

তাঁর কলমের জাদুতে বাংলা গান পেয়েছে নতুন ভাষা— যেখানে ব্যবসায়িক দক্ষতা মিশেছে মননের শিল্পে, যেখানে হৃদয়ের অনুভব দাঁড়িয়েছে যুক্তির পাশে সমান মর্যাদায়।

জন্মদিনে শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা

আজ ১২ অক্টোবর, আসিফ ইকবালের জন্মদিন। বাংলাদেশের সংগীত ও কর্পোরেট জগত একসঙ্গে শ্রদ্ধা জানায় তাঁকে—কারণ তিনি একাধারে সৃষ্টিশীল কবি, পরিকল্পনাশীল মস্তিষ্ক, আর নিরন্তর মানবিক মানুষ।

তিনি প্রমাণ করেছেন—
নেতৃত্ব মানে শুধুই অফিস নয়,
গান মানে কেবল সুর নয়,
জীবন মানে এক অবিরাম অনুসন্ধান—সৌন্দর্যের, কর্মের, ভালোবাসার।

শুভ জন্মদিন, আসিফ ইকবাল।
আপনার শব্দের সুরে, আপনার পরিশ্রমের আলোয়,
বাংলাদেশ আজও শিখছে—স্বপ্ন দেখা যায়, যদি মন থেকে চাওয়া যায়।