শ্রেয়া ঘোষাল: সংগীতে নতুন আদর্শ ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত

ভারতীয় সংগীত জগতের মেলোডি কুইন বা সুরের জাদুকরী বলা হয় শ্রেয়া ঘোষালকে। ‘মেরে ঢোলনা’র ক্ল্যাসিকাল মুর্ছনা থেকে শুরু করে ‘চিকনি চামেলি’র মতো চটুল আইটেম সং—সবক্ষেত্রেই নিজের কণ্ঠের জাদু দেখিয়েছেন তিনি। তবে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই কিংবদন্তি গায়িকা এমন এক সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন, যা তাঁর ভক্তকুলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অরিজিৎ সিংয়ের প্লেব্যাক ছাড়ার গুঞ্জনের পর শ্রেয়ার এই নতুন অবস্থান সংগীত শিল্পে নৈতিকতার এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।

দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ও নৈতিক অবস্থান

শ্রেয়া ঘোষাল স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে তিনি আর তথাকথিত ‘আইটেম সং’ বা যে গানে নারীদের ‘অবজেক্টিফাই’ (পণ্য হিসেবে উপস্থাপন) করা হয়, তেমন গানে কণ্ঠ দেবেন না। ‘অগ্নিপথ’ সিনেমার জনপ্রিয় গান ‘চিকনি চামেলি’ গাওয়ার সময় তাঁর কোনো অস্বস্তি না হলেও, বর্তমান পরিণতিবোধ থেকে তিনি মনে করেন এই ধরণের গানের কথায় অনেক সময় অশ্লীল ইঙ্গিত বা নারীদের প্রতি অসম্মানজনক পঙ্‌ক্তি থাকে।

তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এক গীতিকার বন্ধুর একটি গানে ‘আমাকে চিকেন বানিয়ে খেয়ে নাও’—এমন অদ্ভুত ও রুচিহীন কথা থাকায় তিনি সরাসরি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। শ্রেয়ার মতে, জনপ্রিয়তার নেশায় শিল্পের মান এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকে বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয়।


শ্রেয়া ঘোষালের সংগীত দর্শনের বিবর্তন

বিষয়অতীত অবস্থানবর্তমান অবস্থান ও সিদ্ধান্ত
গানের ধরণআইটেম সং ও চটুল গান গেয়েছেন।কেবল অর্থবহ ও মার্জিত গান গাইবেন।
নারীর উপস্থাপনশৈল্পিক মনে করে গেয়েছেন।নারীদের পণ্য বানানোর লিরিক বর্জন করবেন।
মঞ্চ পরিবেশনাসব ধরণের হিট গান গাইতেন।শিশুদের সামনে গাইতে অস্বস্তি হয় এমন গান বর্জনীয়।
পরিণতিবোধপঙ্‌ক্তির গভীর অর্থ তখন বুঝতেন না।প্রতিটি শব্দের প্রভাব বিশ্লেষণ করে গান বাছবেন।

সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মঞ্চ পরিবেশনা

একজন শিল্পীর কাছে তাঁর ভক্তরা কেবল গানের সুর নয়, ব্যক্তিত্বও প্রত্যাশা করেন। শ্রেয়া জানান, কোনো গান জনপ্রিয় হলে তা স্টেজ শো বা লাইভ কনসার্টে গাইতে হয়। অনেক সময় দর্শকদের মধ্যে ছোট শিশুরা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে আপত্তিকর ইঙ্গিতবাহী গান গাওয়া তাঁর কাছে নৈতিকভাবে ভুল মনে হয়। তিনি বলেন, “তখন আমি গানের পঙ্‌ক্তির গভীরতা হয়তো বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝি। শিল্পের নামে কুরুচিকর উপস্থাপনা আর নয়।”

শ্রেয়া আরও যোগ করেন যে, ‘চিকনি চামেলি’ গানটি তিনি ভালোবেসেই গেয়েছিলেন এবং সেখানে শিল্পের ছোঁয়া ছিল। তবে পরবর্তীকালে তাঁর কাছে আসা অনেক গানের প্রস্তাব ছিল সরাসরি অসম্মানজনক। তাই ভবিষ্যতে রেকর্ড করার ক্ষেত্রে তিনি লিরিক বা গানের বাণীর ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবেন।

সংগীত জগতের নতুন পথচলা

শ্রেয়ার এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি কেবল জনপ্রিয়তার পেছনে দৌড়ানো কোনো গায়িকা নন, বরং একজন সচেতন মানুষ হিসেবে নিজের কণ্ঠকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে চান। অরিজিৎ সিংয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় শিল্পীদের এমন ভিন্নধর্মী চিন্তা ভাবনা ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে লিরিকের মানোন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। শ্রেয়া ঘোষাল প্রমাণ করলেন, সময় ও অভিজ্ঞতার সাথে একজন প্রকৃত শিল্পীর আদর্শও পরিবর্তিত এবং উন্নত হয়।