দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হলো। চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রখ্যাত কণ্ঠযোদ্ধা এবং বরেণ্য নজরুল সংগীতশিল্পী ডালিয়া নওশীনের কণ্ঠ। আজ বুধবার দুপুর ১২টা ৫৭ মিনিটে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর।
Table of Contents
অসুস্থতা ও প্রয়াণ
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ডালিয়া নওশীন দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন। গত কয়েক বছর তাঁর জীবন কেটেছে হাসপাতাল আর বাসার চার দেয়ালের মাঝে। সম্প্রতি তাঁর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটলে গত ২৭ মার্চ তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও আজ দুপুরে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর খবরটি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন তাঁর খালাতো বোন এবং বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী সাদিয়া আফরিন মল্লিক।
শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি
মরহুমার জানাজা আজ বাদ মাগরিব রাজধানীর গুলশান সোসাইটি মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে। এরপর তাঁকে বনানী কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও পরম শ্রদ্ধায় দাফন করা হবে। ডালিয়া নওশীন ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জননী। তাঁর দুই ছেলে বর্তমানে প্রবাসে অবস্থান করছেন; একজন যুক্তরাষ্ট্রে এবং অন্যজন স্পেনে বসবাস করেন।
জীবনের বর্ণিল অধ্যায় ও অবদান
ডালিয়া নওশীন কেবল একজন শিল্পীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সাক্ষী। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গান গেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠের গান রণাঙ্গনে যুদ্ধরত সৈনিকদের দেশপ্রেমে উজ্জীবিত করেছিল।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যশিল্পের পথিকৃৎ, প্রখ্যাত স্থপতি মাজহারুল ইসলামের কন্যা। পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারা বজায় রেখে তিনি শুদ্ধ সংগীত চর্চায় নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে নজরুল সংগীতে তাঁর দখল ছিল ঈর্ষণীয়। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ২০২০ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ প্রদান করে।
একনজরে ডালিয়া নওশীনের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
| বিষয় | তথ্য |
| নাম | ডালিয়া নওশীন |
| পিতার নাম | স্থপতি মাজহারুল ইসলাম |
| বিশেষ পরিচয় | স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও নজরুল সংগীতশিল্পী |
| মৃত্যুর তারিখ | ১ এপ্রিল, ২০২৬ (বুধবার) |
| মৃত্যুকালে বয়স | ৭১ বছর |
| মৃত্যুর কারণ | দীর্ঘস্থায়ী ক্যানসার |
| প্রধান সম্মাননা | একুশে পদক (২০২০) |
| দাফন স্থান | বনানী কবরস্থান, ঢাকা |
সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া
ডালিয়া নওশীনের প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক ও সংগীত অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর সহকর্মী ও অনুরাগীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শোক প্রকাশ করছেন। বিশিষ্ট সংগীতবোদ্ধাদের মতে, ডালিয়া নওশীনের প্রয়াণ মানে একটি যুগের অবসান। নজরুল সংগীতের প্রচার ও প্রসারে তিনি যে শুদ্ধতা বজায় রেখেছিলেন, তা বর্তমান প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
মুক্তিযুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে হারমোনিয়াম হাতে তাঁর দেশাত্মবোধক গানগুলো বাংলার মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি চলে গেলেও তাঁর গাওয়া গান এবং দেশের প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাঁকে বেঁচে রাখবে অনন্তকাল। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
