পাগল হাসানের সংগীত ঐতিহ্য সংরক্ষণ

দিবাগত বাউল শিল্পী পাগল হাসানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর সংগীতভাণ্ডার সংরক্ষণ ও অপ্রকাশিত গান জনসমক্ষে আনার লক্ষ্যে একটি বিস্তৃত সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রাঙ্গণে অবস্থিত বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে “স্মৃতিতে পাগল হাসান” শীর্ষক একটি স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাঁর নিজ জেলা সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় পারিবারিক ও স্থানীয় পর্যায়ে দোয়া মাহফিল এবং স্মরণসভা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।

পাগল হাসান ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার সুরমা সেতু এলাকার কাছে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র তেত্রিশ বছর। স্বল্প জীবনের মধ্যেই তিনি বাংলার লোকসংগীত ও বাউল গানের ভুবনে নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর গাওয়া “আসমানে যাইও না রে বন্ধু” গানটি বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং শ্রোতামহলে গভীর আবেগ সৃষ্টি করে।

আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সংগীতকে সংরক্ষণ, পুনঃপ্রকাশ এবং গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় প্রতি বছর তাঁর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশেষ আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি তাঁর গান নিয়ে গবেষণা, ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং পুনঃসংগীতায়োজন কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত হবে।

স্মরণানুষ্ঠানে তাঁর একটি অপ্রকাশিত গান প্রথমবারের মতো প্রকাশ করা হবে। ইতোমধ্যে প্রায় বিশটি অপ্রকাশিত গান শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলো পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে নতুন গান পাওয়া গেলে সেগুলোকেও সংরক্ষণ ও প্রকাশের আওতায় আনা হবে। এই গানগুলো তাঁর নিজস্ব সংগীত প্রকাশ মাধ্যমের মাধ্যমে ধাপে ধাপে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে।

এছাড়া তরুণ সংগীত পরিচালক ও শিল্পীদের তাঁর গান নতুনভাবে সংগীতায়োজন করার আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তাঁর সৃষ্টিকর্ম আরও বিস্তৃত শ্রোতামহলে পৌঁছাতে পারে। তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত কয়েকটি গান যেমন “মাদুলি”, “দশ দুয়ারি মাইয়া” এবং “বাগানের মালী” ইতোমধ্যে শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে “বাগানের মালী” গানটি একটি ব্যান্ড দলের সঙ্গে তাঁর সহযোগিতায় তৈরি হয়েছিল, যা তাঁর সৃষ্টিশীলতার বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।

আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত আয় ভবিষ্যৎ প্রকাশনা, সংরক্ষণ কার্যক্রম এবং তাঁর পরিবারের সহায়তায় ব্যয় করা হবে। পুরো কার্যক্রমটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সহকর্মী এবং সংগীত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যুক্ত রয়েছেন। পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আসিফ আকবর এবং ধ্রুব গুহ।

আগামী ২ জুন পাগল হাসানের জীবন ও সংগীতকে কেন্দ্র করে একটি বৃহৎ স্মরণোৎসব আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে পৃথক আরেকটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ২০১১ সালে লুতফর বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দুই পুত্রসন্তানের জনক ছিলেন।

বাংলার বাউল ও মরমি সংগীত ঐতিহ্যে পাগল হাসানের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নিচে উদ্যোগের প্রধান দিকগুলো উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়বিবরণ
স্মরণানুষ্ঠানস্মৃতিতে পাগল হাসান, ঢাকা
স্মরণস্থানছাতক, সুনামগঞ্জ
অপ্রকাশিত গানপ্রায় বিশটি গান শনাক্ত
প্রকাশ মাধ্যমনিজস্ব সংগীত প্রকাশ ব্যবস্থা
বিশেষ পরিকল্পনাবার্ষিক স্মরণ ও পুনঃসংগীতায়োজন প্রকল্প
অতিরিক্ত আয়োজনবৃহৎ স্মরণোৎসবের পরিকল্পনা

এই উদ্যোগকে আয়োজকরা পাগল হাসানের সংগীত ঐতিহ্য সংরক্ষণে একটি দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন।