বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের নেপথ্যের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ‘সারগাম’ স্টুডিও ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ফারুক আহমেদ বাদল গত ২ মে, ২০২৬ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে দেশের ব্যান্ডসংগীত ও আধুনিক গানের বিকাশে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর এই অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ করে সম্প্রতি স্মৃতিচারণা করেছেন প্রখ্যাত ব্যান্ড ‘ফিডব্যাক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক ফোয়াদ নাসের বাবু। তাঁর সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই ফারুক আহমেদ বাদলের অবদানের বিভিন্ন দিক এখানে তুলে ধরা হলো।
প্রথম সাক্ষাৎ ও ফিডব্যাকের আত্মপ্রকাশ
ফারুক আহমেদ বাদলের সাথে ফোয়াদ নাসের বাবুর প্রথম দেখা হয়েছিল বাবুর নিজের বাসভবনে। ফোয়াদ নাসের বাবুর শৈশবের বন্ধু মাসুদের মাধ্যমে এই পরিচয় ঘটেছিল। সেই প্রথম সাক্ষাতেই বাদল ফিডব্যাক ব্যান্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ গানের অ্যালবাম প্রকাশ করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তৎকালীন সময়ে ফিডব্যাক ব্যান্ড কেবল বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) জন্য একটি বা দুটি বাংলা গান রেকর্ড করেছিল। ফলে ১২টি গান নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম তৈরির প্রস্তাব প্রথমে কিছুটা আকস্মিক মনে হলেও বাদলের বিনয়, আন্তরিকতা ও গভীর উৎসাহ দেখে ফিডব্যাক ব্যান্ড এই কাজে সম্মত হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় ফিডব্যাকের প্রথম অ্যালবাম ‘ফিডব্যাক সেলফ টাইটেলড’। অ্যালবামটি বাজারে আসার পর অভূতপূর্ব সাফল্য ও বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সারগামের ব্যানারে মাইলফলক সৃষ্টি
প্রথম অ্যালবামের পর ফিডব্যাক ব্যান্ডের আরও দুটি বিখ্যাত অ্যালবাম সারগামের ব্যানার থেকেই প্রকাশিত হয়। তৎকালীন অডিও বাজারে ডিস্কো, তিতুপীরা ও জাহিদ ইলেকট্রনিকসের মতো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সক্রিয় থাকলেও ‘সারগাম’-এর আত্মপ্রকাশ ছিল বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বিশেষ করে ব্যান্ড অ্যালবামের ক্ষেত্রে সারগাম পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছিল, কারণ সে সময়ে ব্যান্ডসংগীতের পেছনে বড় অঙ্কের আর্থিক ঝুঁকি নেওয়ার সাহস সমসাময়িক খুব কম প্রতিষ্ঠানেরই ছিল।
নিচে সারগামের ব্যানারে প্রকাশিত ফিডব্যাকের প্রধান অ্যালবাম এবং বাদলের উদ্যোগে সম্পন্ন হওয়া অন্য দুটি ঐতিহাসিক অ্যালবামের তালিকা দেওয়া হলো:
শিল্পীদের স্বাধীনতা ও অনন্য ব্যক্তিত্ব
ফোয়াদ নাসের বাবুর মতে, ফারুক আহমেদ বাদলকে কখনোই কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মকর্তা বা ব্যবসায়ী মনে হতো না। বয়সে কিছুটা ছোট হওয়া সত্ত্বেও তিনি সংগীতশিল্পীদের অত্যন্ত সম্মান ও সমীহ করে চলতেন। সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল, তিনি গানের ধারা, সুর বা ধরন নিয়ে কখনো শিল্পীদের ওপর নিজের কোনো মতামত বা বাণিজ্যিক চাপিয়ে দিতেন না। শিল্পীরা স্বাধীনভাবে যা সৃষ্টি করতেন, তা নিয়েই তিনি সন্তুষ্ট থাকতেন এবং তা প্রকাশে উদ্যোগী হতেন।
বাদলের অনন্য প্রচেষ্টার কারণেই সুমনা হকের ‘মায়াবী এ রাতে’ এবং নিলয় দাসের ‘কত যে খুঁজেছি তোমায়’ অ্যালবাম দুটির কাজ সফলভাবে শেষ করা সম্ভব হয়েছিল। সংগীত পরিচালক হিসেবে ফোয়াদ নাসের বাবু মনে করেন, এই দুটি অ্যালবামের সৃষ্টির কারণেই আজও বহু শ্রোতা তাঁকে মনে রেখেছেন।
সংগীত সংশ্লিষ্টদের মতে, ফারুক আহমেদ বাদল ছিলেন দেশের সংগীত অঙ্গনের এক নীরব বিপ্লবী। একঝাঁক নতুন ও প্রতিভাবান শিল্পীকে শ্রোতাদের মাঝে পরিচিত করার পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। জীবনের একপর্যায়ে তিনি দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমান এবং গত ২ মে তাঁর এই নীরব প্রস্থান দেশের সংগীত জগতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।
