দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত জ্যাজ সুরকার ও পিয়ানোবাদক আবদুল্লাহ ইব্রাহিম ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। দীর্ঘ সংগীতজীবনে ৭০টিরও বেশি অ্যালবাম রেকর্ড করা এই শিল্পী কিছুদিন অসুস্থ থাকার পর জার্মানিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সোমবার (১৫ জুন) তার পরিবারের পক্ষ থেকে এক বিবৃতির মাধ্যমে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
পরিবারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে তার সঙ্গী ড. মেরিনা উমারি জানান, আবদুল্লাহ ইব্রাহিম শান্তিপূর্ণভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা ও তার মানুষের প্রতি গভীর অনুরাগ বজায় রেখেছিলেন। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থান করলেও নিজের দেশের সঙ্গে তার সংযোগ অটুট ছিল।
কেপটাউনে জন্মগ্রহণ করা এই শিল্পীর জন্মনাম ছিল ‘অ্যাডলফ জোহানেস ব্র্যান্ড’। অল্প বয়স থেকেই সংগীতের প্রতি তার আগ্রহ গড়ে ওঠে। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি সুর করা শুরু করেন এবং ১৫ বছর বয়সে পেশাদার সংগীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৫০-এর দশকে তিনি ‘ডলার ব্র্যান্ড’ নামে স্থানীয় জ্যাজ অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করেন।
১৯৬০ সালে ‘দ্য জ্যাজ এপিসেলস’ ব্যান্ডের সঙ্গে তিনি একটি অ্যালবাম রেকর্ড করেন, যা ‘জ্যাজ এপিসেল ভার্স ওয়ান’ নামে পরিচিত। এই অ্যালবামটি কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান সংগীতশিল্পীদের দ্বারা রেকর্ড করা প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য জ্যাজ এলপি হিসেবে বিবেচিত। যদিও তাদের সংগীত সরাসরি রাজনৈতিক ছিল না, তবুও সে সময়ের বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার কারণে তারা নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন।
১৯৬০-এর দশকে তিনি ইউরোপে চলে যান এবং সেখানে তার প্রতিভা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। এই সময় তিনি আমেরিকান জ্যাজ কিংবদন্তি ডিউক এলিংটনের নজরে আসেন। এলিংটন তাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যান, যা তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। পরবর্তীতে জ্যাজ সুরের সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সংগীতধারার সমন্বয়ে তিনি নিজস্ব স্বতন্ত্র শৈলী গড়ে তোলেন।
১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার বিখ্যাত ট্র্যাক ‘ম্যানেনবার্গ’ দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এই সৃষ্টির মাধ্যমে তার সংগীত কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিদেশে বসবাস করলেও তিনি নিয়মিতভাবে নিজ দেশে ফিরে আসতেন এবং সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। মৃত্যুর প্রায় তিন মাস আগে কেপটাউন আন্তর্জাতিক জ্যাজ উৎসবে তিনি তার শেষ লাইভ পারফরম্যান্স করেন।
সংগীতজীবনের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রের জন্যও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর রচনা করেছেন। ফরাসি নির্মাতা ক্লেয়ার ডেনিসের ‘নো ফিয়ার, নো ডাই’ এবং ‘চকোলেট’ চলচ্চিত্রে তার কাজ উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি ‘জার্মান জাজ ট্রফি’সহ বিভিন্ন সম্মাননা অর্জন করেন এবং দক্ষিণ আফ্রিকান মিউজিক লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন।
নিচে তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | অ্যাডলফ জোহানেস ব্র্যান্ড |
| পরিচিত নাম | আবদুল্লাহ ইব্রাহিম / ডলার ব্র্যান্ড |
| জন্মস্থান | কেপটাউন, দক্ষিণ আফ্রিকা |
| পেশা | জ্যাজ সুরকার ও পিয়ানোবাদক |
| অ্যালবাম সংখ্যা | ৭০টির বেশি |
| উল্লেখযোগ্য কাজ | ‘ম্যানেনবার্গ’ (১৯৭৪) |
| প্রথম বড় ব্যান্ড কাজ | ‘দ্য জ্যাজ এপিসেলস’ (১৯৬০) |
| মৃত্যু | জার্মানি, ৯১ বছর বয়সে |
আবদুল্লাহ ইব্রাহিমের দীর্ঘ সংগীতজীবন এবং তার অবদান আন্তর্জাতিক জ্যাজ সংগীতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকবে।
