গান, নৃত্য ও পুতুলনাট্যের পরিবেশনার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হয়েছে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারকে। তাঁর ৯১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয় চিত্রশিল্প, পুতুলনাট্য, মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন এবং দেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর বহুমুখী অবদানের কথা।

রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গতকাল সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ এই স্মরণ আয়োজন। ‘রং, রেখা, কল্পনা ও নান্দনিকতার আজীবন সাধক’ শিরোনামের অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে মাল্টিমিডিয়া পাপেট থিয়েটার ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। গান, নৃত্য ও পুতুলনাট্যের পরিবেশনার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে মুস্তাফা মনোয়ারের সাবেক সহকর্মী ও শিক্ষার্থীরা তাঁর কর্মজীবন, শিল্পভাবনা এবং ব্যক্তিগত স্মৃতি নিয়ে কথা বলেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুর পর তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক আয়োজন। চলতি বছরের ২৯ জুন তাঁর মৃত্যু হয়। ফলে জন্মবার্ষিকী ঘিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানটি তাঁর সহকর্মী, শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিভিন্ন পরিবেশনায় তাঁর সৃষ্টিশীলতা, নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং শিল্পের প্রতি আজীবন নিষ্ঠার বিষয়গুলো উঠে আসে।

বাংলাদেশের পুতুলনাট্যের বিকাশে মুস্তাফা মনোয়ারের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পুতুলনাট্যকে কেবল শিশুদের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং এর মাধ্যমে মানুষের জীবন, সামাজিক বাস্তবতা, মানবিক মূল্যবোধ ও নানা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর শিল্পচর্চায় কল্পনা ও নান্দনিকতার সঙ্গে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটেছে।

চিত্রশিল্পী হিসেবেও মুস্তাফা মনোয়ারের স্বতন্ত্র পরিচিতি ছিল। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি তিনি মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য তাঁর সৃষ্টিশীল কাজ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। পুতুলনাট্য ও শিশুতোষ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছে শিল্প ও কল্পনার জগতকে সহজভাবে তুলে ধরেছেন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর শিল্পচর্চা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মানসিক স্বস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি পুতুলনাট্যের আয়োজন করেন। যুদ্ধের ভয়াবহ বাস্তবতার মধ্যে শিশুদের বিনোদন ও মানসিক প্রশান্তির সুযোগ করে দেওয়ার এই উদ্যোগ তাঁর শিল্পভাবনার মানবিক দিকটি স্পষ্ট করে।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পুতুলনাট্যের চর্চাকে আরও বিস্তৃত ও আধুনিক ধারায় এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর কাজের মধ্য দিয়ে পুতুলনাট্য শিল্পের নান্দনিক ও সৃজনশীল সম্ভাবনা নতুনভাবে সামনে আসে। একই সঙ্গে শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে শিল্প ও সংস্কৃতির ভূমিকার বিষয়টিও তাঁর কর্মকাণ্ডে গুরুত্ব পেয়েছে।

টেলিভিশনে তাঁর বিভিন্ন কাজও দর্শকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। শিশু-কিশোরদের উপযোগী অনুষ্ঠান ও পুতুলনাট্যের মাধ্যমে তিনি বিনোদনের পাশাপাশি কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং মানবিক মূল্যবোধ বিকাশের সুযোগ তৈরি করেছিলেন। তাঁর কাজের সঙ্গে বেড়ে ওঠা বহু দর্শকের কাছে এসব সৃষ্টি এখনও স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালে মুস্তাফা মনোয়ার একুশে পদক লাভ করেন। চিত্রশিল্প, পুতুলনাট্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘ অবদান তাঁকে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

জন্মবার্ষিকীর আয়োজনটিতে তাই শুধু একজন শিল্পীকে স্মরণ করা হয়নি; একই সঙ্গে তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টিশীল ধারাকেও নতুন করে সামনে আনা হয়েছে। গান, নৃত্য ও পুতুলনাট্যের মতো ভিন্ন ভিন্ন শিল্পমাধ্যমকে একই আয়োজনে যুক্ত করার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পভাবনার বহুমাত্রিক দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

সাবেক সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচারণে ফিরে আসে তাঁর কর্মজীবনের নানা অধ্যায়। শিল্পীদের পরিবেশনাতেও প্রতিফলিত হয় তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিভিন্ন দিক। তাঁর কাজের সঙ্গে যুক্ত রং, রেখা, কল্পনা, নান্দনিকতা এবং মানবিকতার যে সমন্বয়, স্মরণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেটিই নতুন করে দর্শকদের সামনে উপস্থাপিত হয়।

মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পজীবন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিকাশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাজ শুধু একটি নির্দিষ্ট শিল্পমাধ্যমে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং নানা মাধ্যমে তাঁর দীর্ঘ সৃজনশীল পথচলা দেশের শিল্পচর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠান সেই বহুমুখী উত্তরাধিকারকে স্মরণ করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর কাজ ও শিল্পদর্শন পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস হিসেবে উঠে এসেছে।